পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ধারে ভারে আর দশটা দলের থেকে বরাবরই এগিয়েই থাকে ব্রাজিল। যে কোনো টুর্নামেন্টে হলুদ জার্সিধারীদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া যেন আর কোনো ফলাফলে মান বাঁচে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসব অতীত এখন অনেকটাই মলিন। সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের দুই দশকের খরার সঙ্গে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বেও ভাটার টান। এক সময়কার ‘ফুটবলের ওয়ান্ডারল্যান্ড’ ব্রাজিল খুঁজে ফিরছে নিজেদের হারানো গৌরব।
এমনই এক পরিস্থিতিতে প্রথাগত নিয়ম ভেঙে গুরুদায়িত্ব তুলে দেওয়া হলো বিদেশি কোচকে। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে যা বিরলতম ঘটনাতো বটেই। তাও যেন-তেন কেউ নয়, অনেকটা ছোঁ মেরে উড়িয়ে আনা হলো রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক বস ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। যার হাত ধরে চলমান বিশ্বকাপে ‘হেক্সা’ স্বপ্নে বুঁদ দলটির সমর্থকরাও।
আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল দলে বেশকিছু পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি সম্ভবত খেলার চিরায়ত ট্যাকটিক্সে বদল।
আনচেলত্তির অধীনে সেলেসাওয়ের ৩৩টি গোলের মধ্যে ৮টিই এসেছে প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে বল ছিনিয়ে নেওয়ার পর। অর্থাৎ প্রতি চারটি গোলের একটি এসেছে হাই প্রেসিং থেকে।
ইতালিয়ান কোচের অধীনে নিজেদের অর্ধে নেমে ডিফেন্সে ব্যস্ত থাকার বদলে প্রতিপক্ষের অর্ধেই তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে ভিনি-কুনহারা। উদ্দেশ্য একটাই- প্রতিপক্ষকে ভুল করাতে বাধ্য করা এবং দ্রুত বল কেড়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণে উঠা।

এই কৌশলই এখন ব্রাজিলের অন্যতম কার্যকর অস্ত্র। আনচেলত্তির অধীনে সেলেসাওয়ের ৩৩টি গোলের মধ্যে ৮টিই এসেছে প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে বল ছিনিয়ে নেওয়ার পর। অর্থাৎ প্রতি চারটি গোলের একটি এসেছে হাই প্রেসিং থেকে।
সর্বশেষ স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচেও এই পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ব্রাজিলের প্রথম দুটি গোলই এসেছে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নেওয়ার পর। এমনকি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আরেকটি গোলও করেছিলেন একই ধরনের পরিস্থিতি থেকে। যদিও পরে ভিএআরের সিদ্ধান্তে সেটি বাতিল হয়ে যায়।
দলের অনুশীলনে নিয়মিত এমন ড্রিল করানো হয়, যেখানে একদল খেলোয়াড় বল ধরে রাখার চেষ্টা করেন, আরেক দল সেটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এই কৌশল অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুনে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে আনচেলত্তির ব্রাজিল প্রথম যে গোলটি করেছিল, সেটিও এসেছিল প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের কাছাকাছি বল কেড়ে নেওয়ার পর।
অনুশীলনেও এই পরিকল্পনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন আনচেলত্তি। দলের অনুশীলনে নিয়মিত এমন ড্রিল করানো হয়, যেখানে একদল খেলোয়াড় বল ধরে রাখার চেষ্টা করেন, আরেক দল সেটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বল পুনরুদ্ধার করতে পারলেই দ্রুত কয়েকটি পাস খেলে গোলের দিকে শট নিতে হয়। ম্যাচ-পূর্ব ভিডিও বিশ্লেষণ ও ট্যাকটিক্যাল ব্রিফিংয়েও এই বিষয়টি বারবার তুলে ধরা হয়।
স্কটল্যান্ড ম্যাচের পর আনচেলত্তি বলেন, ‘এই দলের ইচ্ছাশক্তি বা মানসিকতায় কখনই ঘাটতি ছিল না। আমাদের সমস্যা ছিল খেলার মানগত দিক থেকে। শুরু থেকেই আমরা যে অনেক গোল করেছি, তার বেশির ভাগই এসেছে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার পর। মিশর ও পানামার বিপক্ষের প্রীতি ম্যাচেও এমন হয়েছে। বল পুনরুদ্ধার করতে পারা আসলে দলের মানসিকতা ও সংগঠিত চাপেরই প্রমাণ।’
পরিসংখ্যানও ব্রাজিলের এই পরিবর্তনের পক্ষে সায় দিচ্ছে। বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে সেলেসাও প্রতিপক্ষকে বাধ্য করেছে ১০৮ বার বল হারাতে।
এই কৌশলের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, বল প্রতিপক্ষের গোলের কাছেই ফিরে পাওয়ায় রক্ষণভাগকে অনেক দূর থেকে আক্রমণ গড়তে হয় না। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দেরও নিজেদের অর্ধে দীর্ঘ সময় দৌড়ে রক্ষণ সামলাতে হয় না। ফলে শক্তি সঞ্চয় হয়, আবার প্রতিপক্ষের অগোছালো রক্ষণকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত গোলের সুযোগও তৈরি করা যায়।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও আনচেলত্তির এই হাই প্রেসিং কৌশল যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেটাই মনে করা হচ্ছে।
এফআই/এমএমএম

