World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

ফিরছে ‘গিজনের কলঙ্কের’ স্মৃতি, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধের ম্যাচ?

ফিরছে ‘গিজনের কলঙ্কের’ স্মৃতি, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধের ম্যাচ?

এই বিশ্বকাপে জে গ্রুপের দুই রাউন্ডের খেলা শেষে প্রত্যাশিত ফলাফলের দেখা পাওয়া গেছে। শেষ গ্রুপ ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত করেছে। ইতোমধ্যে বাদ পড়া জর্ডানের বিপক্ষে তারা খেলবে শতভাগ পয়েন্টের রেকর্ড ধরে রাখতে।

একমাত্র প্রশ্ন হলো, সমান তিন পয়েন্ট করে পাওয়া অস্ট্রিয়া নাকি আলজেরিয়া দ্বিতীয় স্থানে থাকবে এবং তারা সেটা আদৌ চায় কি না। টুর্নামেন্টের ব্র্যাকেট অনুযায়ী, এই গ্রুপের রানার্সআপ শেষ ৩২-এ স্পেনের মুখোমুখি হবে।

শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে যে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একটি দল জেতার ব্যাপারে খুব একটা চিন্তিত নয়। কিন্তু অস্ট্রিয়ার ক্ষেত্রে এমন চিন্তা আসা প্রথম নয়।

স্পেনে অনুষ্ঠিত ১৯৮২ বিশ্বকাপে গিজনের এল মলিননে শেষ গ্রুপ ম্যাচে ইচ্ছা করেই ১-০ গোলে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে যায়, যে ফলাফল দুই দলকেই তুলেছিল নকআউটে, বাদ পড়েছিল আলজেরিয়া এবং ওই ঘটনা চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপকে। এই ঘটনা ‘গিজনের কলঙ্ক’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

ওইবার স্পেনে আলজেরিয়ার শুরুটা হয়েছিল দারুণভাবে। অভিষেকে ডেজার্ট ওয়ারিয়র্স ১৯৭৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল, যেটা ছিল বিশ্বকাপে সর্বকালের অন্যতম সেরা অঘটন। অবশ্য তারা দ্বিতীয় ম্যাচে ২-০ গোলে অস্ট্রিয়ার কাছে হেরে যায়, তবুও পরের পর্বে ওঠার পথে ভালো অবস্থানে ছিল তারা।

অস্ট্রিয়ার কাছে ১-০ গোলে এবং পশ্চিম জার্মানির কাছে ৪-১ গোলে চিলি হারার পর আলজেরিয়া তৃতীয় ও শেষ রাউন্ডে খেলতে নেমেছিল ২ পয়েন্ট নিয়ে (ওই সময় জয়ের জন্য ২ পয়েন্ট, ড্রয়ের জন্য ১)। চার পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে ছিল অস্ট্রিয়া, জার্মানিরও ছিল ২ পয়েন্ট এবং গোলপার্থক্যে তারা দ্বিতীয় স্থানে ছিল।

ওভেইদোদে ২৪ জুন আলজেরিয়ার শেষ গ্রুপ ম্যাচ ছিল চিলির সঙ্গে, পরের দিন পশ্চিম জার্মানি-অস্ট্রিয়া। প্রথমার্ধে তিন গোলের লিড ছিল আলজেরিয়ার, কিন্তু দুই গোল হজম করে। ৩-২ গোলে জিতে অস্ট্রিয়ার সমান চার পয়েন্ট পায় আফ্রিকান দেশটি।

হজম করা দুটি গোলই গ্রুপে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। তাতে করে সমীকরণ দাঁড়ায়, পশ্চিম জার্মানি এক বা দুই গোলে অস্ট্রিয়াকে হারালেই আলজেরিয়াকে বিদায় করে দুই দলই নিরাপদে দ্বিতীয় পর্বে পৌঁছে যাবে।

ম্যাচের ১১ মিনিটে জার্মানির হর্স্ট রুবেশ গোল করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেওয়ার পর দুই দলের খেলোয়াড়রা আক্রমণ করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। তারা কেবল মাঠে বল পাস করে সময় নষ্ট করতে থাকেন। স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং আলজেরিয়ান সমর্থকরা ফুটবলারদের দিকে ব্যাংক নোট বা টাকা ছুড়ে মারেন। ধারাভাষ্যকারও ধারাভাষ্য দেওয়া বন্ধ করে দেন। স্থানীয় স্প্যানিশ পত্রিকা এল কমার্সিও ম্যাচের বিবরণীটি খেলার পাতায় না ছেপে ‘অপরাধ’ বিভাগে প্রকাশ করেছিল। এই লজ্জাজনক ঘটনার পর ফুটবল বিশ্বকাপ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফেয়ার প্লে বা সততা বজায় রাখার জন্য ফিফা নিয়ম পরিবর্তন করে। তখন থেকে নিয়ম করা হয় যে, গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচ একই দিনে এবং একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে, যেন কোনো দল সমীকরণ জেনে পাতানো খেলার সুযোগ না পায়।

সেই অস্ট্রিয়াকে আলজেরিয়া পাচ্ছে গ্রুপের শেষ ম্যাচে। সেই ‘গিজন কলঙ্কের’ ৪৪ বছর পর গ্রুপের শেষ ম্যাচে প্রথমবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্যই যেন নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে এই ম্যাচ, দুই দলই না জেতার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ খুঁজছে। জিততে চাইছে না কোনো দলই। জয় বাদে অন্য যে কোনো ফলাফল নকআউট রাউন্ড ড্রতে দুই দলকেই সুবিধা দেবে। কারণ জয়ী দল দ্বিতীয় স্থানে থেকে ‘এইচ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে পাবে। আর তৃতীয় স্থানে থাকলে তুলনামূলকভাবে সহজ প্রতিপক্ষ ‘বি’ গ্রুপ জয়ী সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে।

গোলপার্থক্যে এগিয়ে অস্ট্রিয়া, দ্বিতীয় স্থানে থাকতে কেবল ড্র প্রয়োজন। আর ড্র করলে আলজেরিয়া তৃতীয় স্থানেই থাকবে। আর এই কারণে দুই দলের কেউই জিততে চাইছে না। হারতে চাইছে দুই দলই, বিশেষ করে অস্ট্রিয়া, আর আলজেরিয়া চাইছে কেবল না জিততে। অস্ট্রিয়াকে স্পেনের মুখে ফেলে ‘গিজন কলঙ্কের’ প্রতিশোধ নেওয়ার দারুণ সুযোগ আফ্রিকান দলটির সামনে।

কিন্তু জয় এড়াতে চাইছে, এমন গুঞ্জনে অস্ট্রিয়া কোচ রালফ রাগনিক বলেছেন, ‘না, একদমই না। একবার শুরু হলে আমরা জানতে পারব, কিন্তু এটি আমাদের ম্যাচকে প্রভাবিত করবে না। আগামীকাল যদি আমাদের ম্যাচ ড্র হয়, আমরা চালিয়ে যেতে পারব, কিন্তু আমরা কোনো ম্যাচে শুধু এই কথা বলে খেলতে নামতে পারি না যে, ‘আমরা ড্র করার জন্যই খেলব’।”

আলজেরিয়া কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ, দ্বিতীয় স্থানে থাকতে তার দলের জয় প্রয়োজন। তিনিও একই বার্তা দিলেন, স্পেনকে এড়াতে তারা জয়ের চেয়ে ড্রয়ের দিকে মনোযোগী নয়। তিনি বলেন, ‘ফুটবলে যদি বা কিন্তু বলে কিছু নেই, আমাদের প্রতিপক্ষের সামনে একইভাবে দাঁড়াতে হবে, ভালো পারফর্ম করার উচ্চ আকাঙ্ক্ষা ও জয়ের সদিচ্ছা। আমরা দেখব মাচের পর কী হয়, কিন্তু এগিয়ে যেতে এবং আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হলে প্রথমে খেলাটি জেতার চেষ্টা করে তা অর্জন করতে হবে।’

অস্ট্রিয়ান মিডফিল্ডার কোনরাড লাইমার বলেছেন, ‘আমরা মাঠে নামব, জিততেই চাইব। কার মুখোমুখি হচ্ছি, সেটা কোনো ব্যাপার না।’

এফএইচএম