ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন দেড়টা পেরিয়ে গেছে। বাইরে বিজয়োল্লাসের মুর্হুমুর্হু ধ্বনি। রাউন্ড অব বত্রিশের ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের জয়ের পর ঢাকাসহ সারা দেশেই উদযাপনে মেতে উঠতে দেখা যায় লাতিন জায়ান্ট দলটির বাংলাদেশি সমর্থকদের। আবার ধরা যাক, ভোর ৪ টায় আর্জেন্টিনার খেলা, সন্ধ্যা থেকেই সবার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। টিএসসিসহ যেসব জায়গায় বড় পর্দায় খেলা দেখানো হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। রাত যত বাড়ে, সবার ঘুম যেন তত ওড়ে।
উত্তর আমেরিকায় বসেছে বিশ্বকাপের এবারের আসর, আর সেই উত্তেজনার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারের বিশ্বকাপের বেশিরভাগ ম্যাচই বাংলাদেশ সময় মধ্য রাত, ভোর কিংবা সাতসকালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর এই বিপরীতমুখী টাইমজোনের (সময়ের ব্যবধান) কারণে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও প্রভাব ফেলছে।
এবারের আসরের ‘সিংহভাগ’ ম্যাচই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সময়ের পার্থক্য ১১-১২ ঘণ্টারও বেশি। তবুও ‘ম্যানেজ’ করে খেলা দেখছেন অনেকেই। অনেকে আবার বেশি রাত হওয়ার কারণে সেভাবে খেলা দেখতে পারছেন না। এ নিয়ে জানতে বেশ কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
রাশেদ শাহরিয়ার পলাশ নামের এক ফুটবলপ্রেমী বলছিলেন, ‘পছন্দের দলের খেলা হলে সেটা যখনই হোক দেখা হয়। এটা আবেগ বা ভালোবাসার কারণে। ভালো দলের খেলাও দেখি। তবে সব খেলা দেখা হয়ে ওঠে না। বাসার বাইরে থাকলে ওটিটি ফ্ল্যাটফর্মে খেলা দেখি। যেহেতু বিনোদন বলতে তেমন কিছু নেই আমাদের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে, তাই খেলাটাকে উপভোগ করি।’

তরুণ প্রজন্মের অনেকেই সারা বছর ক্লাব ফুটবল অনুসরণ করেন। যে কারণে মধ্য রাত পেরিয়ে খেলা দেখা তাদের কাছে নতুন কোনো অভিজ্ঞতা না। তবে বিশ্বকাপের সময়টাতে দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে যায়। বছরজুড়ে যারা সেভাবে ফুটবল দেখেন না, যে কোনো টুর্নামেন্ট শুরু হলে তারাও টিভির সামনে ভিড় জমান। বিশেষ করে ফুটবল বিশ্বকাপ হলে তো কথাই নেই। তরুণ থেকে বৃদ্ধ-এ সময়টাতে টিভি পর্দায় চোখ থাকে সব বয়সীদেরই। কেউ দল বেঁধে বাইরে বড় পর্দায় কেউবা আবার বাসায় নিরিবিলি পরিবেশে খেলা উপভোগ করে থাকেন।
রেজওয়ান আহমেদ সাকিব যেমনটা বলছেন, চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসে, কথা হলো যেভাবেই হোক খেলা দেখতে হবে। দিনে হলে কোনোভাবেই পারতাম না, রাতে ঘুম একটু কম হলেও মানিয়ে নিয়ে খেলা দেখতে পারি। সকাল ৮ টার ম্যাচ দেখতে একটু সমস্যা শুধু, অফিসে যেতে হয় তখন।
বিশ্বকাপের গুরুত্ব সবার কাছেই অনন্য। একেকটা মুহূর্তও যেন কেউ হাতছাড়া করতে চান না। অনেকের ক্লাব ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতাও এখন কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। বিনায়েক রহমান নামের এক ফুটবল সমর্থক যেমনটা বলছিলেন, আগে রাত জেগে খেলা দেখে সকালে উঠে ক্লাসে যেতাম, এখন রাত জেগে খেলা দেখে সকালে উঠে অফিসে যাই। অভ্যাস যেহেতু আছেই তাই খুব একটা অসুবিধা হয় না। ঘুমটা শুধু একটু কম হয় এই যা। তবে এটা মানিয়ে নিয়েছি একদমই। বিশ্বকাপ তো একবারই। বারবার আসে না। আর যেহেতু আগে থেকে রাত জেগে খেলা দেখার অভ্যাস আছে খুব একটা কষ্ট হয়ও না।
খেলা দেখতে গিয়ে ‘ঘুমের বারোটা’ বাজছে অনেকেরই। মেহেদী হাসান তালহা বলছিলেন, বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে দৈনিক ৩ ঘণ্টাও ঘুম হয় না। সারা দিন মাথা ভন ভন করে। এবারই মনে হয় সবগুলো ম্যাচ পুরোটাই দেখছি। আরেক সমর্থক রাশিকুর রহমান রিফাত বলছিলেন, দৈনিক ৫-৬ কাপ কফির ওপর আছি। রাত ২-৩ টায় যেটা শুরু হয় ওই ম্যাচ দেখতে পারি৷ অফিসে মোটামুটি ১ ঘণ্টা দেরিতে ঢুকে আবার এক ঘণ্টা দেরিতে বের হচ্ছি। এভাবেই চলছে আপাতত।
বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে দৈনিক ৩ ঘণ্টাও ঘুম হয় না। সারা দিন মাথা ভন ভন করে। দৈনিক ৫-৬ কাপ কফির ওপর আছি। রাত ২-৩ টায় যেটা শুরু হয় ওই ম্যাচ দেখতে পারি৷ অফিসে মোটামুটি ১ ঘণ্টা দেরিতে ঢুকে আবার এক ঘণ্টা দেরিতে বের হচ্ছি। এভাবেই চলছে আপাতত।
তবে খেলা দেখতে কেউ কেউ আবার কায়দা করে ঘুমের রুটিনেও বদল এনেছেন। রিপন তালুকদার নামের এক ফুটবলপ্রেমী তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলছিলেন, ভোর রাতের ম্যাচ দেখার জন্য সন্ধ্যার পর হালকা ঘুমিয়ে নেই। আরাফাত আহমেদ রিফাত নামের আরেক ফুটবলপ্রেমী বলছিলেন, সব ম্যাচ দেখা হয় না। যেগুলোতে বেশি আগ্রহ থাকে, সেগুলোই দেখি। নকআউটের বেশিরভাগ ম্যাচই দেখার চেষ্টা করছি। বিশ্বকাপের জন্য ঘুমের রুটিনও একটু পরিবর্তন করতে হয়েছে। শেষরাতের ম্যাচ হলে আগে একটু ঘুমিয়ে নিই। এভাবেই চলছে।

মধ্যরাতের পরে হওয়ায় অনেকে আবার খেলা দেখতেই পারেন না। তাদের জন্য ভরসা ম্যাচ হাইলাইটস। মিতুইল তৌহিদ নামের এক কর্মজীবি নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বেশি রাতের ম্যাচগুলোর লাইভ রেজাল্ট পিন করে রাখি আর পরে হাইলাইটস দেখি। লাবিব আহমেদ নামের একজন বলেন, সবার পক্ষে সব ম্যাচ দেখা কখনোই সম্ভব না। আপনি রাত ১১টার ম্যাচ দেখে আবার ভোর ৫-৬টার খেলা দেখতে পারেন না। গুরুত্বপূর্ণগুলো দেখে বাকিগুলো পরে হাইলাইটস দেখতে হচ্ছে।
খেলা দেখতে কেউ কেউ আবার কায়দা করে ঘুমের রুটিনেও বদল এনেছেন। রিপন তালুকদার নামের এক ফুটবলপ্রেমী তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলছিলেন, ভোর রাতের ম্যাচ দেখার জন্য সন্ধ্যার পর হালকা ঘুমিয়ে নেই।
সর্বশেষ ২০২২ বিশ্বকাপ মধ্যপ্রাচ্যে হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে সময়ের পার্থক্য ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার। যে কারণে টাইমজোনের পার্থক্য নিয়ে খুব একটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি এদেশের দর্শকদেরও। আশরাফ ইবনে ওসমান নামের একজন যেমনটা বলছিলে, সর্বশেষ দুটা টুর্নামেন্ট আমাদের টাইম ফ্রেন্ডলি হওয়ায় সবাই উপভোগ করেছিল। এবার ‘ডাই হার্ড’ ফ্যান ছাড়া দর্শক বেশি হওয়ার কথা না।
এশিয়ার দর্শকসংখ্যা বেশি হওয়ায় বিশ্বকাপের ম্যাচের সময়ে বিবেচনা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন রেজওয়ান আহমেদ সাকিব নামের একজন। তিনি বলেন,বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সব ম্যাচ দেখা কঠিন সব দর্শকের জন্য, তবে সেমি কোয়ার্টার এর টাইমগুলো আবার কিছুটা ঠিক আছে, দর্শকদের কথা চিন্তা করে ফিফার টাইমজোন নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ এশিয়ায় তুলনামূলক দর্শক বেশি।
নিজ দেশের অংশগ্রহণ না থাকলেও বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনার এতটুকুন কমতি নেই যেন। এজন্যই হয়তো ফিফার অফিসিয়াল পেজেও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দেখে না, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে বাঁচে’।
এফআই

