বিশ্বকাপের নকআউট রাউন্ডের প্রতিটি মুহূর্ত ও সিদ্ধান্তের রেশ কতদূর যেতে পারে– তার উজ্জ্বল উদাহরণ আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ। বিতর্কে ঘেরা এই ম্যাচে ৩-২ গোলে হেরে আসর থেকে ছিটকে গেছে প্রথমবার শেষ ষোলোয় ওঠা মিশর। আর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। ম্যাচটিতে রেফারির বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, যার রেশ হয়তো অনেকদিন টানতে হতে পারে!
আলোচনার প্রধান কেন্দ্রে রয়েছে– ফাউলের কারণে মিশরের গোল বাতিল এবং একই সম্ভাবনা থাকলেও আর্জেন্টিনার গোল বৈধ হওয়ার বিষয়টি। ৬২ মিনিটে ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা অবস্থায় মিশরের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার মোস্তফা জিকো দারুণ এক গোল করেন। কিন্তু ভিএআর দেখে সেই গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান রেফারি। মূলত মিশরের আক্রমণে যাওয়ার আগমুহূর্তে তাদের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া ফাউল করেছিলেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে।
ভিএআর থেকে রেফারিকে দৃশ্যটি মনিটরে দেখতে বলা হলেও, তিনি রিভিউ শেষে গোল বাতিলের রায় দেন। এ ছাড়া শেষদিকে দুটি ফাউলের আবেদন জানায় মিশর। দুটিই ছিল আর্জেন্টিনার বক্সের ভেতর। যার মধ্যে একটি যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এবং তাদের দাবি করা ফাউলের পরই এনজো ফার্নান্দেজের গোলে ৩-০ ব্যবধানে লিড নেয় আর্জেন্টিনা। প্রথম ফাউলের ঘটনায় মিশরের হামদি ফাতির জার্সি টেনে ধরতে দেখা যায় আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে। তিনি পড়ে গেলেও রেফারি ফাউল ধরেননি। এরপর আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় মোহামেদ সালাহকে ফাউল করেন হুলিয়ান আলভারেজ। ফাউল তো দূর, এমনকি রিভিউতে যায়নি সেটি।
ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান আইএফএবির (ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড) নিয়ম অনুযায়ী, একটি ঘটনার রিভিউ করা যাবে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ঘটনার আগের ও পরের খেলার মুহূর্ত ফুটবলীয় আইন এবং ভিএআর প্রটোকল দ্বারা নির্ধারিত হবে। গোল হওয়ার আগে বা গোল করায় আক্রমণকারী দল যদি ফাউল বা নিয়মভঙ্গ (হ্যান্ডবল, ফাউল, অফসাইড ইত্যাদি) করে, তবে তা রিভিউ করার অনুমতি দেওয়া হবে।’
রেফারিং বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর বিশ্লেষণে প্রিমিয়ার লিগের সাবেক রেফারি গ্রাহাম স্কট বলছেন, মিশরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। গোলের আগে আত্তিয়ার সঙ্গে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের সংঘর্ষ ছিল স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শ, যা ফাউল হিসেবে গণ্য করার মতো নয়। এমনকি ঘটনাটি গোলপোস্ট থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ঘটেছিল এবং এরপর আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের পুনর্গঠিত হয়ে রক্ষণের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। তাই ভিএআর পর্যালোচনার মাধ্যমে গোল বাতিল হওয়ায় মিশরের ক্ষোভ স্বাভাবিক।
স্কটের বিশ্লেষণে বলা হয়, ঘটনায় কিছুটা পায়ের সংস্পর্শ এবং খুব অল্প সময়ের জন্য জার্সি ধরে রাখার ঘটনা থাকলেও, সেটি ভিএআরের হস্তক্ষেপের মতো কোনো স্পষ্ট ফাউল ছিল না। আক্রমণভাগের পুরো প্রক্রিয়া ভিএআর নিয়মিত পরীক্ষা করলেও গোল বাতিল করতে হলে পরিষ্কার ও স্পষ্ট ফাউল থাকতে হয়। সাধারণভাবে কোনো সংঘর্ষের পর যত বেশি সময় ও দূরত্ব অতিক্রম করে গোল হয়, সেই সংঘর্ষকে ফাউল হিসেবে বিবেচনার মানদণ্ড তত বেশি কঠোর হওয়া উচিত। কিন্তু এই ঘটনায় ভিএআরের হস্তক্ষেপের মতো কিছুই ছিল না।
একই যুক্তিতে ম্যাচের শেষদিকে মোহামেদ সালাহর পেনাল্টির দাবিও সঠিকভাবেই নাকচ হয়েছে বলে মত দেন স্কট। তার ভাষায়, সালাহর বুটে সামান্য স্পর্শ থাকলেও সেটি ফাউল দেওয়ার মতো ছিল না।
অন্যদিকে, রেফারির সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ফুটবল রেফারিং বিশেষজ্ঞ ডক্টর জো মাচনিক। তিনি ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষণে বলেন, যেহেতু ঘটনাটি ফাউল ছিল, তাই গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্তটিই সঠিক। এটি অনেক আগে থেকেই ভিএআর প্রটোকল বা নিয়মের অংশ। এই প্রযুক্তি চালুর একদম শুরুর দিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কোনো ফাউলের সূত্র ধরে গোল হলে, সেই গোল কোনোভাবেই বৈধতা পাবে না।
পরবর্তী বিশ্লেষণে তার দাবি– নিয়ম অনুসারে ফাউল ও গোলের মধ্যকার কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব ৫ সেকেন্ড আগে বা ৭৫ গজ দূরে হতে হবে, এমন কোনো সময়সীমার কথা বলা হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ দল বলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পাচ্ছে বা নতুন কোনো মুভ তৈরি করতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধরে নেওয়া হবে ওই ফাউলের মাধ্যমেই বলের দখল নেওয়া হয়েছিল এবং সেই আক্রমণ থেকেই গোলটি এসেছে। এটি পুরোপুরি নিয়ম মেনেই করা হয়েছে, আর ঠিক এ কারণেই গোলটি বাতিল করা হয়।
ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক রব গ্রিন সম্প্রচারের সময় বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই ভিএআরের পর্যালোচনার আওতায় পড়ে না।’ পরে মাচনিকের যুক্তির বিরোধিতা করে ইংল্যান্ডের সাবেক এই গোলরক্ষক বলেন, ঘটনাটি মাঠের একেবারে অন্য প্রান্তে, প্রায় ১০০ গজ দূরে ঘটেছে। কারও পায়ের আঙুলে সামান্য চাপ পড়ার জন্যই তো ভিএআর চালু করা হয়নি। ভিএআর তার ক্ষমতার সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। রেফারি ঘটনাটি দেখেছিলেন এবং ফাউল দেননি। অথচ দারুণ এক পাল্টা আক্রমণ থেকে পাওয়া মিশরের গোল বাতিল করে তাদের দুই গোলের লিড থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে এক যুগেরও বেশি সময় রেফারিং করা অ্যান্ডি ডেভিসের মতে, মিশরের আক্রমণে অংশ নেওয়ার ওপর তাদের ফাউল দুটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেনি। তাই এটিকে পেনাল্টি দেওয়ার মতো ফাউল বলা যায় না। ম্যাক অ্যালিস্টার ফাতির জার্সি ধরে টানার ঘটনাটি অল্প সময় এবং আলভারেজের করা ফাউলের চেয়ে সালাহ’র পেনাল্টি পাওয়ার চেষ্টা বেশি ছিল। অন্যদিকে, মিশরের ডিফেন্ডার আত্তিয়ারের করা ফাউলটি আর্জেন্টিনার আক্রমণ বিনষ্ট হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। সেই ফাউলের সরাসরি ফল হিসেবেই মিশর গোলটি করেছিল। তাই নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বাতিল করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, যদিও ঘটনাটি বক্সের বেশ বাইরে মিশরের অর্ধে ঘটেছিল বলে এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু একই আক্রমণপর্বে যদি কোনো ফাউলের সরাসরি পরিণতিতে গোল হয়, তাহলে সেই গোল বাতিল করতে হয়। রেফারিকে যখন একসঙ্গে জার্সি টানা ও পায়ে পা রাখার দৃশ্য দেখানো হয়, তখন তার পক্ষে আগের সিদ্ধান্ত (গোল) বহাল রাখা অসম্ভব ছিল।
আরও যারা যা বললেন
বিবিসি স্পোর্ট–এর সাংবাদিক ডেল জনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘এই টুর্নামেন্টে যেভাবে রেফারিং হয়েছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল মিশরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত। সামান্য সংস্পর্শে ফাউল দেওয়া হয়নি আগের কোনো কোনো ম্যাচে। একই ধরনের সামান্য জার্সি টানার ঘটনায় ভিএআরের মাধ্যমে গোল বাতিল করা যায় না।’
তার পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইংলিশ কিংবদন্তি অ্যালান শিয়েরার লেখেন, ‘হয় উভয় ঘটনাই ফাউল, নয়তো কোনোটিই নয়। অথচ আমাদের বলা হয়েছিল ভিএআর দিয়ে আবার নতুন করে রেফারিং করা হবে না।’
ক্রীড়া বিশ্লেষক জেরোনিমো মরগান্স প্রশ্ন তোলেন, এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের আগে আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে মিশরের খেলোয়াড়দের ওপর হওয়া দুটি স্পষ্ট ফাউল কেন ভিএআর পর্যালোচনা করেনি। মার্টিনেজের ওপর ফাউলের অভিযোগে মিশরের দ্বিতীয় গোল বাতিল করা হলো। তাহলে অন্য ঘটনায় একই আচরণ হলো না কেন? এটি সম্পূর্ণ অন্যায়। মিশরকে ডাকাতি করা হয়েছে।
ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে সংবাদমাধ্যম ইএসপিএনও লিখেছে, ভিএআরের ‘মিশন ক্রিপ’ বা ধীরে ধীরে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের প্রবণতা এবার মিশরের ক্ষতির কারণ হয়েছে। তাদের মতে, এই ম্যাচে ভিএআরের সম্পৃক্ততা ফলাফলে অতিরিক্ত প্রভাব ফেলেছে এবং এই বিতর্ক মিশরের দৃষ্টিকোণ থেকে বহু দিন, এমনকি বহু বছর ধরে আলোচিত হবে।
এএইচএস

