World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

এক্সপ্লেইনার

ইংল্যান্ড যেভাবে ‘নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছে’

ইংল্যান্ড যেভাবে ‘নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছে’

২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্যারেথ সাউথগেটের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ হন থমাস টুখেল। জার্মান এই কোচকে বলা হচ্ছিল নকআউট বিশেষজ্ঞ এবং ধারণা ছিল, প্রতিপক্ষভেদে আলাদা কৌশল সাজিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি ইংল্যান্ডকে পথ দেখাবেন। কিন্তু সেই টুখেলের সাজানো কৌশল অনুসরণ করতে গিয়েই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছে ১৯৬৬ বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

সাউথগেটের অধীনে অধীনে ইংল্যান্ড বেশকিছু বড় ম্যাচ জিতলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলটিকে প্রায়ই নিষ্ক্রিয় মনে হয়েছে। প্রতিপক্ষের কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আনতে না পারায় শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়ে তারা। ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ ২২ মিনিটে সেই লিড ধরে রাখতে পারেনি ইংল্যান্ড।

আবারও একই ফল দেখল ইংল্যান্ড। তবে এবার কেউ টুখেলকে নিষ্ক্রিয় বলতে পারবে না। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই হার ছিল ‘সক্রিয়ভাবে ডেকে আনা বিপর্যয়’ এবং একটি আত্মঘাতী ধস। নিজেদের সিদ্ধান্তেই নিজেদের পেনাল্টি বক্সে ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকে ইংল্যান্ড। যার পরিণতিতে বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়। আর আর্জেন্টিনা নিশ্চিত করে ফাইনালের টিকিট।

টুখেলের জানা ছিল– আর্জেন্টিনা নকআউট পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে জিতেছিল। তা সত্ত্বেও তিনি ডিফেন্স মন্ত্র বেছে নেন। সেটা যে টেকসই নয়, মিনিট দশেকের মধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে। আরও নিখুঁতভাবে দেখলে মাত্র ৭ মিনিটের ঝড়ে শেষ ৬০ বছর পর ইংলিশদের আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার স্বপ্ন। মেসি-লাউতেরোদের আক্রমণে ইংল্যান্ডের ডিফেন্স ভেদ হয়েছে বারবার। পিকফোর্ড একবার গোললাইন সেভ করেছেন। পোস্টে লেগে ফেরত আসে একাধিক শট। 

৮৪ মিনিট পার হওয়ার পর ইংলিশরা একটু হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। তখন পর্যন্ত তারা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে। বাকি স্রেফ মিনিট দশেক। তবে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনাও দমার নয়। যা তারা কেপ ভার্দে, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে খেলা বের করে প্রমাণ দিয়ে আসছে। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব থাকা ইংল্যান্ডের সঙ্গে যে শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়বে তা প্রতি মুহূর্তেই জানান দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত হয়েছে–ও তাই, এনজো ফার্নান্দেজ ৮৫ মিনিটের বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শট এবং যোগ করা সময়ে লাউতারোর হেডে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় আলবিসেলেস্তেদের।

অবশ্য ম্যাচের প্রকৃত মোড় ঘুরে যায় আরও আগে। অ্যান্থনি গর্ডনের দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে পাওয়া ৫৫ মিনিটের গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচ ঠিক টুখেলের পরিকল্পনামাফিক চলছিল। সামনে উঠে খেলতে হচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে। ফলে পেছনে ফাঁকা জায়গাও তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর বদলে ইংল্যান্ড নিজেদেরই বক্সে আশ্রয় নেয়। বেঞ্চে থাকা বুকায়ো সাকা, ননি মাদুয়েকে কিংবা মার্কাস রাশফোর্ডের গতিকে কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখার কোনো চেষ্টা করেননি টুখেল।

১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ড কার্যত আর কোনো আক্রমণই করতে পারেনি। হ্যারি কেইনের একটি ব্লক হওয়া শট এবং মরগান রজার্সের একটি অসমাপ্ত পাল্টা আক্রমণ ছাড়া উল্লেখ করার মতো কিছুই ছিল না। ম্যাচের বাকি অংশের প্রায় পুরোটাই খেলা হয়েছে জর্ডান পিকফোর্ডের গোলপোস্টের সামনে। টুর্নামেন্টের শুরুতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় টুখেল সাকা ও রাশফোর্ডকে নামিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। 

এ ছাড়া পুরো বিশ্বকাপজুড়ে প্রধান কোচ ও সহকারী অ্যান্থনি ব্যারি ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগভিত্তিক খেলোয়াড়দের গতি, শারীরিক সক্ষমতা ও তীব্রতা নিয়ে কথা বলেছেন। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই অস্ত্রই ব্যবহার করলেন না। বরং গুটিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিলেন, যদিও লিয়েন্দ্রো পারেদেস মাঠ ছাড়ার পর এবং নিকোলাস ওতামেন্দি লিসান্দ্রো মার্টিনেজের জায়গায় নামায় আর্জেন্টিনার রক্ষণে গতির বিপক্ষে স্পষ্ট দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল।

টুখেলের সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপ মঞ্চে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম বড় ভুল হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। দ্বিতীয়ার্ধের কুলিং ব্রেকের পর তিনি দলকে আবারও তথাকথিত ‘আজতেকা প্ল্যান’-এ ফিরিয়ে নেন। গর্ডনকে তুলে নিয়ে এজরি কনসাকে নামিয়ে তিন সেন্টার-ব্যাকের সঙ্গে পাঁচজনের রক্ষণ গড়ে তোলেন। এর ফলে ইংল্যান্ড পুরোপুরি নিজেদের বক্সে গুটিয়ে যায়। মেক্সিকোর বিপক্ষে এই কৌশল সফল হয়েছিল, কারণ তারা মূলত রাউল হিমেনেসকে লক্ষ্য করে উঁচু বল খেলছিল।

কিন্তু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একই পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। এতে বক্সের বাইরের বিশাল জায়গা পুরোপুরি মেসির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ম্যাচ শেষ হতে ১২ মিনিট বাকি থাকতে মেসির ভাসিয়ে দেওয়া বল থেকে গঞ্জালেসের আরেকটি হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার পরই বোঝা যাচ্ছিল কী ঘটতে যাচ্ছে। তবুও টুখেল আরও রক্ষণাত্মক হয়ে ওঠেন। ড্যান বার্নকে নামিয়ে দলকে ৫-৪-১ ছকে আরও পিছিয়ে দেন। 

আবার বক্সের সামনে এনজো ফার্নান্দেজকে অবাধে শট নেওয়ার সুযোগ দিলে বক্সে এতজন ডিফেন্ডার রেখে লাভ কী? সমতাসূচক গোলের আগে পিকফোর্ড একবার এনজোর শট কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দিলেও দ্বিতীয়বার আর পারেননি। সমতায় ফেরার পর ম্যাচে জয়ের দাবিদার ছিল কেবল একটি দল। এরই মধ্যে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লাগে। এরপর মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে লাউতারোর হেড আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। সেখান থেকে ইংল্যান্ডের আর ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনাই ছিল না!

এএইচএস