ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস মানেই কোটি কোটি ভক্তের উন্মাদনা, আর এই উন্মাদনা যখন ফাইনাল ম্যাচে রূপ নেয়, তখন রূপ নেয় মহাকাব্যে। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবল দেখেছে অসংখ্য শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল। দেখে নেওয়া যাক ফুটবল ইতিহাসে এখন পর্যন্ত হওয়া সেরা ১০ ফাইনাল।
আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স (২০২২)
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা এবং সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনাল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এটিকে। লুসাইল স্টেডিয়ামে ম্যাচটি ছিল মূলত লিওনেল মেসি বনাম কিলিয়ান এমবাপ্পের এক অবিশ্বাস্য দ্বৈরথ। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে গেলেও এমবাপ্পের জোড়া গোলে সমতায় ফেরে ফ্রান্স। অতিরিক্ত সময়েও ম্যাচ ৩-৩ গোলে ড্র হলে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জিতে মেসির আর্জেন্টিনা সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে।
ইতালি বনাম ফ্রান্স (২০০৬)
বিতর্ক, উত্তেজনা আর ট্র্যাজেডিতে ভরা এক অবিস্মরণীয় ফাইনাল ছিল এটি। ম্যাচের শুরুতেই জিনেদিন জিদানের পেনাল্টি গোলে ফ্রান্স এগিয়ে গেলেও মার্কো মাতেরাৎজি ইতালির হয়ে সমতা ফেরান। তবে অতিরিক্ত সময়ে মাতেরাৎজিকে জিদানের সেই বিখ্যাত ‘হেডবাট’ বা ঢুঁ মারার ঘটনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে থেকে গেছে। লাল কার্ড দেখে জিদান মাঠ ছাড়ার পর ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়, যেখানে ৫-৩ ব্যবধানে জিতে ইতালি তাদের চতুর্থ শিরোপা নিশ্চিত করে।
উরুগুয়ে বনাম ব্রাজিল (১৯৫০)
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন এবং ট্র্যাজেডির নাম ‘মারাকানাজো’। ঘরের মাঠ মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় ২ লক্ষ দর্শকের সামনে ব্রাজিলের দরকার ছিল মাত্র একটি ড্র। প্রথমার্ধের পর ব্রাজিল এগিয়ে গেলেও উরুগুয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আলসিডেস ঘিঘিয়ার জয়সূচক গোলে পুরো মারাকানা স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে ২-১ ব্যবধানে বিশ্বকাপ জিতে নেয় উরুগুয়ে।

জার্মানি বনাম আর্জেন্টিনা (২০১৪)
মারাকানা স্টেডিয়ামে আরও একটি হাই-ভোল্টেজ ফাইনাল, যেখানে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল অপ্রতিরোধ্য জার্মানির। পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা বেশ কয়েকটি দারুণ সুযোগ হাতছাড়া করে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের শেষভাগে বদলি খেলোয়াড় মারিও গোটশের এক দুর্দান্ত ভলিতে ১-০ গোলের জয় নিয়ে জার্মানি তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলে।
ব্রাজিল বনাম জার্মানি (২০০২)
এশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের এই ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ফুটবলের দুই পরাশক্তি। ১৯৯৮ সালের ফাইনালের ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা ‘ফেনোমেনন’ রোনালদো নাজারিও এই ম্যাচের নায়ক বনে যান। ম্যাচের ৬৭ এবং ৭৯ মিনিটে ওলিভার কানের মতো কিংবদন্তি গোলরক্ষককে পরাস্ত করে রোনালদোর জোড়া গোলে জার্মানিকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ব্রাজিল তাদের পঞ্চম ও ঐতিহাসিক ‘পেন্টা’ শিরোপা জয় করে।
ইংল্যান্ড বনাম পশ্চিম জার্মানি (১৯৬৬)
ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত একমাত্র বিশ্বকাপের এই ফাইনালটি আজীবন মনে থাকবে স্যার জিওফ হার্স্টের হ্যাটট্রিকের কারণে। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। সেখানে হার্স্টের একটি শট গোললাইন পার হয়েছিল কি না, তা নিয়ে আজও ফুটবল বিশ্বে বিতর্ক রয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড।
আর্জেন্টিনা বনাম পশ্চিম জার্মানি (১৯৮৬)
ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী বিশ্বকাপের সেই ফাইনাল ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে শিরোপার সুবাস পাচ্ছিল। কিন্তু পশ্চিম জার্মানি দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে পরপর দুই গোল করে ম্যাচ ২-২ সমতায় আনে। খেলা যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ৮৪ মিনিটে ম্যারাডোনার পাস থেকে হোর্হে বুরুচাগা জয়সূচক গোলটি করে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেন।

স্পেন বনাম নেদারল্যান্ডস (২০১০)
দক্ষিণ আফ্রিকার সকার সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ফাইনালটি গোলের চেয়ে ফাউল আর কার্ডের জন্য বেশি পরিচিত ছিল। পুরো ম্যাচে রেফারি মোট ১৪টি হলুদ কার্ড এবং নেদারল্যান্ডসের জন হেইতিঙ্গাকে লাল কার্ড দেখান। ডাচদের একের পর এক ফাউল সামলে অতিরিক্ত সময়ের ঠিক শেষ মুহূর্তে (১১৬ মিনিটে) সেস ফ্যাব্রিগাসের পাস থেকে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক ভলি গোল স্পেনকে এনে দেয় তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা।
ব্রাজিল বনাম ইতালি (১৯৭০)
মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দলীয় পারফরম্যান্সের সাক্ষী হয়েছিল বিশ্ব। কিংবদন্তি পেলের হেডে ব্রাজিল এগিয়ে যাওয়ার পর ইতালি সমতা ফেরায়। তবে দ্বিতীয় হাফে গেরসন, জার্জিনহো এবং অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তোর সেই বিখ্যাত গোলটির ওপর ভর করে ইতালিকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় ব্রাজিল। এই জয়ের মাধ্যমে পেলে তাঁর ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতার অনন্য কীর্তি গড়েন।
উরুগুয়ে বনাম আর্জেন্টিনা (১৯৩০)
বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফাইনাল ম্যাচ, যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে। দুই প্রতিবেশীর এই লড়াইয়ে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। তবে দ্বিতীয় হাফে ঘরের মাঠের দর্শকদের গর্জনে উরুগুয়ে অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলে আরও ৩টি গোল দেয়। শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটি নিজেদের করে নেয় উরুগুয়ে।
এমএমএম/

