World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

দুই চ্যাম্পিয়নের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সৌহার্দ্যের গল্প

দুই চ্যাম্পিয়নের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সৌহার্দ্যের গল্প

বিশ্বকাপ শুরুর আগে শিরোপার রেসে ছিল অনেকেই। তালিকাটা ছোট হতে হতে অবশেষে দুইয়ে এসে ঠেকেছে। ৪৮ দল নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর মঞ্চস্থ হচ্ছে এবার। রেকর্ড ম্যাচ এমনকী ভেন্যু সংখ্যায়ও হয়েছে রেকর্ড। প্রায় দেড় মাসের বিশাল কর্মযজ্ঞের শেষ বাঁশি বাজার অপেক্ষা। 

ফুটবল বিশ্বের সব পথ সব মত যেন আজ মিশেছে নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে। যেখানে আর কয়েক ঘণ্টা পর শিরোপার লড়াইয়ে নামবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। দুই পরাশক্তির খেলার ধরনে ভিন্নতা থাকলেও দলগত তেমন বিরোধ নেই। বরং আছে একরাশ হৃদ্যতার গল্প। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের এককালের শিষ্য ছিলেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। ফলে এবার বিশ্বমঞ্চের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে শিক্ষকের মুখোমুখি হচ্ছেন তারই সুযোগ্য ছাত্র।

স্পেনের বিশ্বকাপ দলটাতে বার্সেলোনার খেলোয়াড়ের ছড়াছড়ি। স্প্যানিশ এই ক্লাবটি যার হাত ধরে গৌরবের শেখরে উঠেছে তিনি আর কেউ নন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার জীবনের গল্প লিখতে গেলে স্পেনের নাম বাদ দেওয়া অসম্ভব। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর তার জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে স্পেনে। মেসি মহাতারকা হয়ে উঠেছেন এই স্প্যানিশ ক্লাবটিতেই। 

একসময় মেসিকে নিজেদের করে পেতে চেষ্টার কমতি রাখেনি স্পেন। সেই গল্পও আর আজ কারও অজানা নয়। চলতি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর স্পেনকে নিয়ে মেসি নিজেই তার আবেগের কথা অকপটে বলেছিলেন। স্পেনের বর্তমান দলটি নিয়ে মেসি বলছিলেন, ‘দলটিকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। বহু বছর ধরে তারা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট ফুটবল দর্শন ধরে রেখেছে। তাদের অনেক খেলোয়াড়কে আমি চিনি, তাদের বিপক্ষে খেলেছি এবং এখনও তাদের খেলা অনুসরণ করি। কয়েকজন তো বার্সেলোনায় খেলে, যে ক্লাবকে আমি মন থেকে ভালোবাসি। এটি একটি বিশেষ ম্যাচ, বিশ্বকাপের ফাইনাল।’ 

শুধু মেসি নন, আর্জেন্টিনার ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনির সঙ্গেও স্পেনের সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের এবং ভীষণ আবেগের। খেলোয়াড়ি জীবনে স্কালোনি স্পেনের ক্লাব দেপোর্তিভো লা করুনিয়ায় খেলেছেন। তবে স্পেনের সাথে তার সংযোগ শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্কালোনির বর্তমান স্থায়ী আবাস স্পেনেরই অন্যতম সুন্দর দ্বীপ মায়োর্কাতে। তার স্ত্রী এলিসা মন্তেরো একজন স্প্যানিশ এবং তাদের সন্তানরাও স্পেনের মাটিতেই বেড়ে উঠেছেন। এমনকি কোচিং ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে স্পেনেরই স্থানীয় একটি ক্লাবের হয়েই কাজ শুরু করেছিলেন স্কালোনি। ফলে আর্জেন্টিনার কোচ হলেও স্পেনের সংস্কৃতি, তাদের জীবনযাত্রা ও মানুষের প্রতি স্কালোনির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অজানা নয়। ফাইনালের আগে স্পেনকে নিয়ে মধুর সমস্যার কথা জানিয়ে স্কালোনি বলছিলেন, যদি আর্জেন্টিনা না জেতে তাহলে অন্তত তাদের পরিবারের (স্কালোনি স্ত্রী-সন্তান) একটি অংশকে খুশি হতে দেখে শান্ত্বনা পাবে।

সব ছাপিয়ে আসন্ন ব্লকবাস্টার ফাইনালের আগে সব আলো কেড়ে নিচ্ছেন দুই দলের দুই তারকা—লিওনেল মেসি এবং লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতা ৩৯ বছর বয়সী মেসি এবং একই ক্লাবের ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক ইয়ামাল এবারই প্রথম মাঠের লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। মেসির উত্তরসূরী হিসেবে ইয়ামালকে ভাবা হয়ে থাকে। তবে তাদের প্রথম দেখার গল্প রূপকথাকেও যেন হার মানাবে। সেই গল্প জানতে হলে আপনাকে ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যেতে হবে প্রায় দুই দশক আগে। ইয়ামাল তখন তিনি ছিলেন নিতান্তই এক শিশু, আর মেসি ছিলেন ২০ বছরের এক উদীয়মান তারকা। একটা রুমে বাথটাবে বসে আছেন ছোট্ট ইয়ামাল। পাশে তার মা। কাঁধ পর্যন্ত নামানো চুলের মেসি ইয়ামালকে গোসল করিয়ে দিতে সাহায্য করছেন! এই ছবিটি এত বছর পর সবার আলোচনার টেবিলে। 

সেদিনের সেই সাক্ষাতের পর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। মেসি বার্সেলোনা ছেড়েছেন ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা হয়ে। অন্যদিকে মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে বার্সার মূল দলে অভিষেক হওয়া ইয়ামাল ইতোমধ্যে জিতেছেন তিনটি লা লিগা এবং স্পেনের হয়ে ইউরো ২০২৪-এর শিরোপা। সম্প্রতি ১৯ বছরে পা রাখা ইয়ামাল ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 

দুই অঞ্চলের দুই চ্যাম্পিয়ন দলের আরও আগেই দেখা হওয়ার কথা ছিল। তাদের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত ‘ফাইনালিসিমা’ ম্যাচটি রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাতিল হয়ে যায়। তবে এবার বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চেই মুখোমুখি হতে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন এবং ইউরোপের সেরারা। স্পেনের নিখুঁত পাসিং ফুটবল ও ম্যাচের ওপর শৈল্পিক নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে লড়বে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার চিরচেনা আবেগ ও লড়াকু মানসিকতা।

টুর্নামেন্টে ফেভারিট হিসেবে খেলতে আসা স্পেন টানা ৩৭টি ম্যাচে অপরাজিত থেকে ফাইনালে পা রেখেছে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে ইউরো চ্যাম্পিয়নরা এতটাই গোছানো ফুটবল খেলছে যে প্রতিপক্ষকে মাঠে কোণঠাসা করে ফেলছে। এই ম্যাচ জিতলে তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ নিজেদের ঘরে তুলবে এবং ইতালির টানা অপরাজিত থাকার আন্তর্জাতিক রেকর্ড ভাঙবে। অন্যদিকে, ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন দলের ১৭ জন সদস্য নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্স যাত্রা এবার মোটেও সহজ ছিল না। কেপ ভার্দে, মিশর, সুইজারল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কঠিন সব লড়াকু ম্যাচ পেরিয়ে তারা ফাইনালে এসেছে। প্রতি ম্যাচেই মেসির গোল, অ্যাসিস্ট এবং জাদুকরী পারফরম্যান্স দলকে খাদের কিনারা টেনে তুলেছে।

আজকের ফাইনালে রেফারি যখন ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজাবেন, তখন এই চেনা আবেগগুলো একপাশে সরিয়ে রেখেই মাঠে নামবেন মেসি-ইয়ামালরা। কিন্তু মাঠের বাইরে স্পেন ও আর্জেন্টিনার এই ফুটবলীয় বন্ধন দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যেই ছড়িয়ে দিয়েছে সম্প্রীতির এক অনন্য আবহ।

এফআই