‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ...।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন ছোট গল্পের এই সংজ্ঞাটি লিখে গিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির জন্যই!
২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে হার, ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালেও হারের স্বাদ পেয়েছিলেন মেসি। দুই ফাইনাল হারের ব্যথা সইতে না পেরে আবেগে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আবারও মাঠে ফিরেছেন মেসি, ফিরেছেন ভয়ঙ্কর রূপেই।
মেসির আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের আক্ষেপ ঘুঁচেছে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। নাটকীয় ফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বানিয়েছেন বিশ্বসেরা। সেবার ফাইনাল শেষে লিওনেল মেসি নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ওটাই বিশ্বেমঞ্চে তার শেষ ম্যাচ। কিন্তু ফুটবল ঈশ্বর বোধহয় তার জন্য অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। চার বছর পর ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা শুধু খেলছেনই না, বরং পুরো আর্জেন্টাইন দলকে একক কাঁধে টেনে নিয়ে গেছেন আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে।
আর এই বয়সেও একের পর এক রেকর্ড গড়েই চলেছেন মেসি। যেন তার পায়ের ধার কমছেই না। আজ রোববারের ফাইনালে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসের পাতায় নতুন রেকর্ড গড়বেন মেসি। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে তিনি হতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনাল খেলা সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড়। এর আগে ১৯৮২ সালে ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ডিনো জফ ৪০ বছর বয়সে ফাইনাল খেলেছিলেন।

চলতি টুর্নামেন্টে মেসির পারফরম্যান্স প্রমাণ করে বয়স যে কেবলই একটি সংখ্যা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোসহ সমসাময়িক বাকি তারকাদের যেখানে বিশ্বকাপ অধ্যায় হতাশায় শেষ হয়েছে, সেখানে মেসি বয়সের সাথে সাথে আরও বেশি ধারালো হয়েছেন।
ফাইনালটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপে মেসির ৩৪তম ম্যাচ, যা তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চেয়ে ৭টি ম্যাচ বেশি। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ৮টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে এখন সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের (১২টি) মালিকও তিনি।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার পর আর কোনো দলের একক কোনো খেলোয়াড়ের ওপর এমন নির্ভরতা দেখা যায়নি, যেমনটা দেখা যাচ্ছে মেসির আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার করা ১৯টি গোলের মধ্যে ১২টি গোলেই সরাসরি অবদান রেখেছেন মেসি (৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট)- যা দলের মোট গোলের ৬৩ শতাংশ!

শুধু তাই নয়, নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতেও প্রভাব রেখেছেন লিওনেল মেসি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর রূপকথাও লেখা হয়েছে মেসির দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টের ওপর ভর করেই।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার পর আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির রূপান্তর ঘটেছে অবিশ্বাস্যভাবে। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রফির খরা কাটানোর পর, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাও জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা। আজ স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল জিতলে মেসির নেতৃত্বে টানা চারটি প্রধান আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়বে আর্জেন্টিনা।
অনেকেই ধারণা করেছিলেন মেজর লিগ সকারে পাড়ি জমানোর পর মেসির ধার কমে যাবে। কিন্তু সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করে মেসি আবারও দেখালেন, কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বলা হয়। তবে এবারের ট্রফি যার হাতেই উঠুক, ৩৯ বছর বয়সে এসে বিশ্বমঞ্চে মেসির এই ফুটবলীয় মাস্টারক্লাস ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে।
এমএমএম/

