World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

যে কৌশলে নির্ধারণ হবে শিরোপা ভাগ্য

যে কৌশলে নির্ধারণ হবে শিরোপা ভাগ্য

ফাইনাল ম্যাচ এর চেয়ে আকর্ষণীয় আর হতে পারে না। একদিকে রয়েছে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সুসংগঠিত ও গোছানো দল, যাদের আছে ১৯ বছর বয়সী সুপারস্টার লামিনে ইয়ামাল। অন্যদিকে রয়েছে ফুটবলের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন একটি দল। যার বয়স এখন ৩৯ বছর হলেও এখনো প্রায় একাই বড় বড় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন।

স্পেন বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো। এর আগে ২০১০ আসরে তারা শিরোপা জিতেছিল। বর্তমান দলটির খেলার ধরন তাদের সেই সোনালী প্রজন্মের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা তাদের সপ্তম ফিফা ফাইনাল খেলতে যাচ্ছে। কেবল জার্মানি বা পশ্চিম জার্মানি (৮ বার) তাদের চেয়ে বেশি ফাইনাল খেলেছে। কাতারে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য ম্যাচের পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখার লক্ষ্য তাদের।

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচের পর স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা এখন হাস্যকর লাগে। গত ১৫ জুন প্রথমবার কোয়ালিফাই করা কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করাটা সে সময় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের জন্য বেশ বিব্রতকর ছিল। কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণভাগের অনড় দেয়াল এবং ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স স্পেনের ২৭টি শট ও ৭৪ শতাংশ বল দখল সত্ত্বেও তাদের আটকে দিয়েছিল।

তবে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের জন্য এটাই ছিল একমাত্র দাগ। পুরো টুর্নামেন্টে তারা এখনো কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়েনি এবং তাদের খেলা সাতটি ম্যাচে মাত্র একটি গোল খেয়েছে। সেটা কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে।

স্পেনের বল দখলের এই আধিপত্য তাদের ফুটবল সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। দলের অধিনায়ক রদ্রি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তার ৬৫৫টি সফল পাস ১৯৬৬ সালের পর থেকে যেকোনো বিশ্বকাপের রেকর্ডে সর্বোচ্চ।

রদ্রির সতীর্থ সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি ৫৫০টি সফল পাস নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার বল পায়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে মাঝমাঠে নিখুঁত পাস দিতে পারদর্শী। প্রতি ম্যাচে গড়ে তিনি ২২টির বেশি লাইনব্রেকিং পাস দিয়েছেন এবং এই পাসগুলোর সাফল্যের হার ৯৪ শতাংশ, যা টুর্নামেন্টে সেরা।

স্পেন প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৯ বা তার বেশি পাসের অন্তত ২৮টি সিকোয়েন্স তৈরি করেছে। চলতি বিশ্বকাপে কোনো দলেরই এই হার এত বেশি নয়।

বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার দুটি বড় সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, দীর্ঘ সময় বলের পেছনে তাড়া করতে করতে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং মানসিকভাবে পিছিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, বল হাতছাড়া হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেন ডিফেন্সে অত্যন্ত আগ্রাসী হয়ে ওঠে। দে লা ফুয়েন্তের দল কাউন্টার প্রেসিংয়ে অসাধারণ। বল হারানোর সাথে সাথেই তারা প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করে এবং আক্রমণ ধরে রাখে।

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, এই টুর্নামেন্টে স্পেনের বল ছাড়া কাটানো সময়ের ১২.২ শতাংশ কেটেছে কাউন্টার প্রেসিংয়ের মাধ্যমে। যা কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। মাঝমাঠে বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি রদ্রি এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি কাউন্টার প্রেসিং বল রিকভারি করেছেন।

স্পেনের টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ফুলব্যাকদের ব্যবহার। মার্ক কুকুরেয়া এবং পেদ্রো পোরোর আক্রমণাত্মক ভূমিকা স্পেনের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ প্রভাব ফেলেছে।

পোরো ও ইয়ামালের ডান প্রান্তের কম্বিনেশন এবং বাম প্রান্তে কুকুরেয়া ও আলেক্স বায়েনার রসায়ন প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে প্রতিনিয়ত চাপে রেখেছে।

আর্জেন্টিনার জন্য চিন্তার বিষয় হলো, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের খাওয়া ৭টি গোলের মধ্যে ৫টিই এসেছে উইং দিয়ে দুর্বল ডিফেন্ডিংয়ের কারণে। জর্ডান, মিশর এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বাম প্রান্ত থেকে আসা ক্রসগুলো তারা ঠিকমতো সামলাতে পারেনি। এছাড়া কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকদের বোকা বানিয়ে পাসিংয়ের মাধ্যমে গোল করেছিল।

যেহেতু স্পেন উইং দিয়ে দারুণ আক্রমণ করে। তাই আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে এই জায়গাটি নিয়ে বেশ সতর্ক থাকতে হবে।

আক্রমণের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার স্বাভাবিক উইঙ্গার বা চওড়া খেলার প্রবণতা কম। এর মানে হলো তাদের ফুলব্যাক সাধারণত নিকোলাস তাগলিয়াফিকো (বামে) ও নাহুয়েল মোলিনা (ডানে) মাঠের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করেন। আর্জেন্টিনার মূল শক্তি হলো মাঝমাঠের সমন্বয়। যেখানে লিওনেল মেসি, এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজ এবং আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো টেকনিক্যাল খেলোয়াড়রা খেলেন।

আক্রমণাত্মক অর্ধে আর্জেন্টিনার ৩৩ শতাংশ টাচ এসেছে মাঠের মাঝের অংশ থেকে। যা এই টুর্নামেন্টে যেকোনো দলের চেয়ে সর্বোচ্চ। তারা মূলত মাঝখান দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে।

আর এর বড় একটা কারণ হলেন মেসি। ৩৯ বছর বয়সী এই জাদুকর এখনো প্রতিপক্ষের এলাকায় অলসভাবে হেঁটে বেড়ান এবং সুযোগ বুঝে হঠাৎ জ্বলে উঠে সর্বোচ্চ ক্ষতি করেন। তিনি হয়তো ম্যাচের ৬৪ শতাংশ সময় হেঁটেই কাটান, কিন্তু মাঠের মুভমেন্ট তার চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না।

শেষ ষোলোতে ওঠা দলগুলোর মধ্যে দলের মোট সুযোগ তৈরির ৩৩ শতাংশই করেছেন মেসি, যা সর্বোচ্চ। আক্রমণাত্মক থার্ডে দলের মোট টাচের ১৯ শতাংশ মেসির, যা টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা।

এই বিশ্বকাপে তার গোল অবদান ১২টি (৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট), যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ। সহজ কথায়, স্পেন কেবল প্রার্থনা করতে পারে যেন ফাইনালে মেসির দিনটি খারাপ যায়। কারণ মেসিই আর্জেন্টিনা, আর আর্জেন্টিনাই মেসি।

এফএইচএম