জীবন-নদীর প্রতিটি বাঁক যেমন নতুন কোনো দিগন্তের সূচনা করে, তেমনি পুরোনো পথকে ফেলে যাওয়ার এক অলিখিত আহ্বানও জানিয়ে দেয়। বিশ্বকাপজয়ী লিওনেল মেসি, সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ক্রোয়েশিয়ার প্রাণভোমরা লুকা মদ্রিচ—যে নামগুলো গত দুই দশক ধরে সবুজ গালিচাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল, সম্ভবত তাদের পদচিহ্ন আর দেখা যাবে না বিশ্বকাপের এই মঞ্চে।
মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অবিনশ্বর গানের কথাগুলো-
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে...
মোহময়ী এক সোনালি প্রজন্মের মহাতারকারা দাঁড়িয়ে আছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রান্তসীমায়। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপটিই হয়ত তাদের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। তারা বিদায় নেবেন এমনকি হয়ত ফুটবল থেকেই। সুদূর মার্কিন মুলুকে হওয়া এবারের বিশ্বকাপ তাই শুধু একটা ট্রফি জয়ের লড়াই ছিল না, ছিল কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় ভেঙে দেওয়া কিছু বিদায়গাথার উপলক্ষও।
এই বিশ্বকাপ দিয়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবল আর বিশ্বকাপ ইতিহাসে দারুণ জ্বলজ্বলে এক প্রতিযোগিতাময় সোনালি অধ্যায়ের মাঠের লড়াই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, লুকা মদ্রিচ, এবং সম্ভবত নেইমারের জন্যও, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে সম্ভবত শেষ আসর হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবল শাসন করা এই মহানায়কদের আর হয়তো বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে না! বিশ্বকাপ শেষ হতে হতে তাই পৃথিবীজুড়ে ভক্তদের মধ্যে জেঁকে বসেছে এক ধরনের হারোনোর বেদনা। আগামীতে প্রিয় তারকাদের দেখতে না পারার আক্ষেপ পোড়াবে তাদের অনেক দিন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো : ৪১ বছর বয়সে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করার বিরল রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। দীর্ঘ দুই দশক ধরে শীর্ষ পর্যায়ে খেলার পর বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই খেলার গতি ও ফিটনেসে পরিবর্তন এসেছে। তাই তিনি চাইলেও হয়তো আরও একটি বিশ্বকাপে খেলতে পারতেন না।
লিওনেল মেসি: ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর কারিগর লিওনেল মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপে আরও একবার শিরোপার কাছাকাছি গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। নিজের ষষ্ঠ আসর খেলার পর যদিও পরবর্তী বিশ্বকাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু খোলাসা করেননি, তবে ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে হয়তো ততদিনে আর নাও দেখা যেতে পারে। হতে পারে শেষ ম্যাচটাই গতকাল ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে খেলে ফেলেছেন এই কিংবদন্তী মহাতারকা।

লুকা মদ্রিচ: ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ ৪০ বছর বয়সে এসেও ক্রোয়েশিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সদ্য সমাপ্ত আসরেই শেষবার বিশ্বকাপে খেলে ফেলেছেন তিনিও। যদিও তিনিও এখনো অবসর ঘোষণা করেননি। তবে চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা তার নেই বললেই চলে।
নেইমার জুনিয়র: নেইমারের বয়স ৩৪ হলেও ক্যারিয়ারজুড়ে মারাত্মক সব ইনজুরি তাকে বারবার মাঠের বাইরে ছিটকে ফেলেছে। এবারের বিশ্বকাপেও তার জায়গা পাওয়ার কথা ছিল না। শেষ পর্যন্ত নেইমারের ওপর ভরসা রাখেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। আর সরাসরি অবসরের ঘোষণা না দিলেও নেইমার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন ঠিকই। নরওয়ের বিপক্ষে হেরে বিদায় নেওয়ার পর বলেছেন, ‘এখানেই শুরু, এখানেই শেষ।’
শুধু এই চারজনই নয়, আগামী বিশ্বকাপে দেখা মিলবে না জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়াল ন্যয়ারকেও। তিনি বিশ্ব ফুটবলে ‘সুইপার-কিপার’ রোলের রূপকার এবং ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান অধিনায়ক। এ ছাড়া বিশ্বকাপের মঞ্চে হয়ত আর খেলবেন না বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনা, মিশরের মোহামেদ সালাহ, ডাচ তারকা ভার্জিল ভ্যান ডাইক, দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিউয়েন মিন এবং মেক্সিকোর গিলের্মো ওচোয়াদের।
এ তালিকায় আছেন আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওটামেন্ডি, ব্রাজিলের কাসেমিরো, বসনিয়ার এডিন জেকো এবং স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডনরাও।
এমএমএম/এফআই
