মেসির আক্ষেপ ঘোচানোর বছর, মেসির অনন্ত আক্ষেপের বছর

Neamat Ullah

৩০ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:১০ এএম


মেসির আক্ষেপ ঘোচানোর বছর, মেসির অনন্ত আক্ষেপের বছর

লিওনেল মেসি কী করে ভুলবেন ২০২১ সালটাকে? একটা আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য কত আক্ষেপ ঝরেছে তার কণ্ঠে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেওছেন, সুযোগ থাকলে একটা বিশ্বকাপের জন্য, নিদেনপক্ষে একটা আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য সবক’টা ব্যালন ডি’অরও জলাঞ্জলি দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না তিনি। 

ভাবুন তো, ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ব্যালন ডি’অর জেতা খেলোয়াড়টা তার সব ব্যক্তিগত অর্জনের মায়া ছেড়ে বলছেন এ কথা, কী অনন্ত আক্ষেপই না ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে একটা শিরোপার জন্য! মেসির সে আক্ষেপ ঘুচেছে গত ১১ জুলাই, তাও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের ডেরায়। রেফারির বাঁশি বেজে উঠতেই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলেছেন; মার্কোস আকুনইয়া, নিকলাস টালিয়াফিকো, রদ্রিগো ডি পলসহ সতীর্থরা তাকে এসে জড়িয়ে ধরছেন, যা চলতি বছর ফুটবল বিশ্বেরই সবচেয়ে ‘আইকনিক’ মুহূর্ত বনে গেছে পরে। এই একটা ছবি, এই একটা মুহূর্তের জন্যই তো ২০২১ টা মেসির জন্য অবিস্মরণীয়ই হওয়ার কথা।

মেসির বছরটাকে ‘বিশেষ’ বানিয়েছে আরও একটা কারণ। চলতি বছরেই যে বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্কটা আনুষ্ঠানিকভাবে চুকেবুকে গেছে তার! গোটা বিশ্বকে হতভম্ভ করে দিয়ে এই ঘোষণাটা বার্সা দিয়েছিল গেল ৫ আগস্ট, মেসির আক্ষেপ ঘোচার আনন্দটা টিকতে পারল না ঠিকঠাক এক মাসও। তার আগেই আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে ছাড়তে হলো তার ২১ বছরের সম্পর্ক। 

সংবাদ সম্মেলনে এসে মুখে রুমাল চেপে নিজে কেঁদে ফেললেন, চোখের জলে ভাসালেন ভক্তদেরও! যে বার্সেলোনা তাকে আজকের মেসি বানিয়েছে, সেই বার্সেলোনাই ছাড়ার আনুষ্ঠানিকতা সারেন আর্থিক সংকটের বলি বনে গিয়ে! চলতি বছরের সবচেয়ে আইকনিক মুহূর্তে এটাও ছিল উল্লেখযোগ্য এক সংযোজন।

Dhaka Post

বছরের সবচেয়ে ‘আইকনিক’ মুহূর্ত বিচারে আসতে পারে ইতালির ইউরো জেতার মুহূর্তটাও। পেনাল্টি শুট আউটে দুটো শট ঠেকিয়ে জয় নিশ্চিত করেও নির্বিকারে হেটে যাচ্ছিলেন জিয়ানলুইজি ডনারুমা, পেছন থেকে জর্জিও কিয়েল্লিনিরা জড়িয়ে ধরাতেই যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। সে মুহূর্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কম আলোচনাও হয়নি। ইতিহাস বিচারেও ইতালির এই শিরোপাজয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ বছরের শিরোপাখরা যে মিটিয়েছিল আজ্জুরিরাও। তবে মেসির দুই মুহূর্ত ছাপিয়ে যেতে পারেনি সেটা। 

Dhaka Post

বার্সেলোনা চলতি বছরের শুরুটা যখন করছিল, বাজে ফর্মে শিরোপার সব আশা প্রায় ম্লানই ছিল দলের। সেখান থেকে টানা জয়ে মেসি দলকে জেতান কোপা দেল রে শিরোপা, একটু এদিক ওদিক হলে হয়তো দলটা জিততে পারতো লা লিগাও। সেটা হয়নি শেষমেশ, তবে দলের এমন দুর্দশা নিয়ে একটা কোপা দেল রেও কম কীসে?

মেসি দলের জন্য কী ছিলেন সেটা তাকে হারিয়ে বার্সেলোনা টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে। ২০১৮ সালে ধারাভাষ্যকার রব পালমার আর্জেন্টাইন তারকাতে বিস্ময় প্রকাশ করতে গিয়ে বলেই ফেলেছিলেন, ‘হোয়্যার উড বার্সেলোনা বি উইদাউট লিওনেল মেসি!’ সে প্রশ্নের জবাবই মিলেছে বছর শেষে, মেসিহীন বার্সা যে চলে গেছে ইউরোপের দ্বিতীয় সারির ক্লাব প্রতিযোগিতা ইউরোপায়। 

সাবেক বার্সা অধিনায়ক পিএসজিতে পাড়ি জমিয়েছেন গেল আগস্টে। তিনি নিজেও কি এরপর ভালো সময় কাটিয়েছেন? তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে বেশ। তবে নতুন ক্লাব, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সময় নিলেও সপ্তম ব্যালন ডি’অরটা থেকে বঞ্চিত হননি তিনি। বছর জুড়ে দুরন্ত পারফর্ম করা রবার্ট লেভান্ডভস্কি, কিলিয়ান এমবাপেদের হারিয়ে জেতেন বর্ষসেরার খেতাব।

Dhaka Post

মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বছরটাও বোধ হয় খুব খারাপ কাটেনি। অন্তত ব্যক্তিগত বিচারে তো বটেই। আলী দায়ীর ১০৯ আন্তর্জাতিক গোলের বিশ্বরেকর্ড ভেঙেছেন, সর্বোচ্চ ক্যারিয়ার গোলের রেকর্ডটাও নিয়েছেন নিজের দখলে। বছরটা তো তারও স্মরণীয়ই হওয়ার কথা! স্মরণীয় হওয়ার কথা ‘ঘরে ফেরার’ কারণেও। জুভেন্তাসকে বিদায় বলে এ বছর আগস্টে তিনি পাড়ি জমান তার ‘বিশ্বসেরা রোনালদো’ হয়ে ওঠার আঁতুড়ঘর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে, ফুটবল বিশ্বে আলোড়ন পড়ে যায় আরও একবার। 

দলীয় অর্জন বিচারেও বছরটায় দারুণ সব ঘটনা ঘটেছে চলতি বছর। মৌসুমের মাঝপথে কোচ বদলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে চেলসি, মৌসুমের শুরুতে দারুণ পিছিয়ে থাকলেও পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি শেষমেশ জিতেছে প্রিমিয়ার লিগ। জুভেন্তাস আর পিএসজি প্রায় সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা লিগ শিরোপাটা খুইয়েছে চলতি বছর। এরপর লা লিগাতেও ৭ বছর পর শিরোপা ফিরে পেয়েছে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ।

তারকাদের দলবদল, এর-ওর শিরোপাজয় তো বটেই, চলতি বছর ফুটবল বিশ্ব তোলপাড় হয়েছে আরও এক ঘটনায়। গেল এপ্রিলে রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের নেতৃত্বে নতুন এক লিগ ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগের’ ঘোষণা দেয় স্পেন, ইংল্যান্ড, ইতালি থেকে শীর্ষ ১২ দল। উয়েফা, ফিফা একে শুরু থেকেই দেখেছে বিদ্রোহী লিগ হিসেবে। সঙ্গে এরপর যোগ হয়েছে ফুটবল সমর্থকদের তীব্র প্রতিবাদও। তাতেই ইংলিশ দলগুলো পিছু হটেছে এই লিগ থেকে। পরে ইতালি থেকে দুই মিলান, আর স্পেনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদও নিজেদের সরিয়ে নেয়। ফলে এই লিগ ‘ধারণা’ থেকে মাঠে গড়ানোয় রূপ নেয়নি শেষমেশ, অন্তত চলতি বছরে তো বটেই। 

এনইউ/এটি

Link copied