যে ট্র্যাজেডি এখনো ইউনাইটেডকে কাঁদায়

Neamat Ullah

০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:৩২ পিএম


যে ট্র্যাজেডি এখনো ইউনাইটেডকে কাঁদায়

৬৪ বছর পেরিয়ে গেছে। বিশ্বের রূপ এর মাঝে বদলেছে কয়েক বার, ফুটবল বিশ্বেরও। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর মাঝে বনেছে ইউরোপসেরা, প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে সফল দল। তবু একটা ব্যাপার রয়ে গেছে তার মতোই। কিংবদন্তীতুল্য ‘বাসবি বেইবস’ নিয়ে তাদের শোক। মিউনিখ ট্র্যাজেডিতে ক্লাবটি হারিয়েছিল তাদের সোনালি প্রজন্ম, তাদের ‘বাসবি বেইবসের’ প্রায় সবাইকেই। সেই এক ট্র্যাজেডি ৬৪ বছর পরও একই তীব্রতা নিয়ে কাঁদায় ইউনাইটেডকে।

৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৮। মিউনিখের ঘড়ির কাঁটা তখন তিনটা ছুঁয়ে যাচ্ছে। ইউরোপিয়ান কাপে শেষ আটে রেডস্টার বেলগ্রেডকে দুই লেগে ৫-৪ ব্যবধানে হারিয়েছিল ইউনাইটেড। প্রথমবার ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে এমন জয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের সীমা ছিল না রেড ডেভিলদের। 

সেই ম্যাচ খেলে দেশে ফিরছিল দল। ভারি তুষারপাত হচ্ছিল সেদিন সকাল থেকেই। তবু বিমানে চড়ে বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল দলটির। লিগ কর্তৃপক্ষের তাড়া ছিল যে! 

আগের দুই মৌসুমে সূচি বিপর্যয় এড়াতে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের আসরে কোনো দল পাঠাতে দেয়নি প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ। কাপ ম্যাচের সূচি ছিল মাঝ সপ্তাহে, আর লিগ ম্যাচ হতো শনিবার সন্ধ্যায়। দুয়ের মাঝে ইউরোপিয়ান কাপ খেলার সুযোগ হতো কোথায়? সে ভাবনা থেকেই মূলত এ পদক্ষেপ নিয়েছিল লিগ কর্তৃপক্ষ।

তবে তৎকালীন ইউনাইটেড কোচ ম্যাট বাসবি ছিলেন নাছোড়বান্দা। হবেনই না কেন, হাতে যখন থাকবে প্রবল পরাক্রমশালি এক দল, তখন ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন কে না দেখবেন? ইউনাইটেড কর্তা-ব্যক্তিদের দিয়ে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমতি আনিয়ে ছাড়লেন ইউরোপিয়ান কাপে খেলার। তবে শর্ত ছিল একটা, কাপ বা লিগের সূচি ধরতে হবে ঠিক সময়ে।

সে চোখরাঙানি এড়াতেই মূলত সেদিন বিমানে চড়ে বসেছিল ইউনাইটেড দল। বেলগ্রেড থেকে ফেরার পথে ফরোয়ার্ড জনি বেরি খুইয়ে বসেন তাঁর পাসপোর্ট।
স্রষ্টা আগেভাগেই তাঁকে সতর্ক করে দিতে চাচ্ছিলেন কি না, কে জানে? 

ইউনাইটেড সে যাত্রায় ভাড়া করেছিল ‘এলিজাবেথান এয়ারস্পিড এয়ারক্রাফট’ এর একটি বিমান। সে বিমানের আবার বেলগ্রেড থেকে ম্যানচেস্টার পর্যন্ত জ্বালানি বহন সক্ষমতা ছিলো না। তাই সেই বিমানকে বাধ্য হয়ে জ্বালানি সংগ্রহের বিরতি নিতে হলো মিউনিখে।

এরপরই বাঁধল বিপত্তিটা। বিমান আবার ওড়াতে গিয়ে চালক দেখলেন পিচ্ছিল রানওয়ে আর সামনের ভারী তুষারপাতে বিমান ওড়ানোই মুশকিল। একপর্যায়ে সব খেলোয়াড়কে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল লাউঞ্জেও।

কিন্তু কর্তাব্যক্তিদের মাথায় সূচি বিপর্যয়ের কথাটা খেলে গেল একটু পরই। নেওয়া হলো তুষারের মধ্যেই বিমান যাত্রার। খেলোয়াড়রা আবারও ফিরে গেলেন বিমানে।  

রানওয়ে ছিল পাতলা তুষারে ছাওয়া। সেখানে গতি বাড়াতে গিয়েই বাধে বিপত্তি। রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে পাশের একটা দালানে ধাক্কা খেয়ে ভাঙে বিমানের বাঁ পাশের ডানা। বিমান থামেনি তখনো, আরেকটু সামনে গিয়ে গাছে ধাক্কা খায়, সঙ্গে সঙ্গে দু’টুকরো হয়ে যায় বিমানটি। একরাশ কালোধোঁয়ায় ছেয়ে যায় বিমানবন্দর এলাকা। প্রাণ হারান ইউনাইটেডের ফুটবলার, ক্লাব কর্মকর্তা, সাংবাদিক সহমোট ২৩ জন।

এই ঘটনায় ইউনাইটেড হারায় তাদের খেলোয়াড় রবার্ট ব্রুনি, মার্ক জোনস, ডানকান এডওয়ার্ডস, টমি টেইলর, এডি কোলম্যান, লিয়াম হুইলান, ডেভিড প্রেগ এবং জিওফ বেন্টকে। দলের কোচ ম্যাট বাসবি সে দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে সে ঘটনা মানসিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল তাকে। ফলে ফুটবল থেকেও তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন।

অনেক বছর পরে স্ত্রীর ইচ্ছাতেই ফুটবলে ফিরেছিলেন আবার। ফুটবলবিশ্ব এ ঘটনাকে আজও চেনে ‘মিউনিখ ট্র্যাজেডি’ নামে। তৎকালীন লিগ চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এ দুর্ঘটনা সামলে উঠেছিলো পরে ঠিকই। সে ধাক্কা সামলে উঠতে তাদের সময় লেগেছিল আরো সাতটা বছর।

ইউনাইটেড সেই ধাক্কা সামলে উঠেছিল বটে, কিন্তু ‘বাসবি বেইবস’ ফেরেনি। তেমন সর্বজয়ী প্রজন্মও রেড ডেভিলরা আর পেয়েছিল কি না, সেটাও তর্কসাপেক্ষ বিষয়। 

ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে তাই সেই দুর্ঘটনাকে স্মরণ করা হয় আজও। এই যেমন গত শুক্রবার রাতে মিডলসবরোর বিপক্ষে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোরা পরে নেমেছিলেন কালো বাহুবন্ধনী; ইউনাইটেডের নারী দল, একাডেমি দলও একই ভাবে স্মরণ করবে দলটিকে। আজ দুপুরে ইউনাটেডের মাঠ ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ক্লাবটির এক ভক্তগোষ্ঠী আয়োজন করেছে এক স্মরণ সভার। ক্লাবের পতাকাও আজ রাখা হয়েছে অর্ধনমিত।

৬৪ বছর আগের এই ট্র্যাজেডি এখনো শোকের ছোঁয়া দিয়ে যায় ক্লাবটিতে। তার বহিঃপ্রকাশটা এভাবেই করছে ইউনাইটেড।

এনইউ/এটি

Link copied