দেশে সস্তা ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার বড় সুযোগ এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে। বেসরকারি খাতের প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পটি প্রয়োজনীয় অনুমতির অভাবে এগোতে পারছে না।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকার অদূরে একটি রিসোর্টে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়। টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এ কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালার মূল বিষয় ছিল ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভবিষ্যত ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল এর প্রয়োজনীয়তা’। অনুষ্ঠানে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোর বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেন।
কর্মশালায় মূল বক্তব্য রাখেন সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান ও মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রজেক্ট লিড মাহমুদ শাহেদ দুটি উপস্থাপনায় সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস, বাংলাদেশে আরও সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা, বিনিয়োগ, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদি তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুনায়েদ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম (বিপিসিএস) প্রকল্পের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম দিকেই সমুদ্রপথের রুট সার্ভে বা জরিপের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সাবমেরিন ক্যাবল ও অন্যান্য কারিগরি সরঞ্জাম তৈরির কাজও সফলভাবে শেষ হয়েছে। এমনকি সমুদ্রের তলদেশে ক্যাবল স্থাপনের জন্য বিশেষায়িত জাহাজও বুকিং দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে ক্যাবল স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ার কথা। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এ সেবা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পটি সংকটজনক পর্যায়ে রয়েছে।
বক্তারা বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তর থেকে অনুমোদন প্রয়োজন। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তি পাওয়া গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও তাদের অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এনওসির অপেক্ষায় রয়েছে। এ অনুমতি না পাওয়ায় ক্যাবল স্থাপনের চূড়ান্ত কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বেসরকারি এ সাবমেরিন ক্যাবল চালু হলে ইন্টারনেটের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল এসএমডব্লিউ-৫-এর মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ পেতে প্রতি টেরাবিটে খরচ হয় প্রায় ২৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে বেসরকারি এ ক্যাবলে একই পরিমাণ ব্যান্ডউইথের খরচ হবে মাত্র ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকারি ক্যাবলের তুলনায় বেসরকারি ক্যাবলে খরচ হবে প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ।
এই বিশাল সাশ্রয়ের সুফল সরাসরি সাধারণ গ্রাহকরা পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি ক্যাবলটি চালু হলে খুচরা পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ইন্টারনেট সেবার মান বা কিউওএস অন্তত ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
কর্মশালায় আসন্ন ব্যান্ডউইথ সংকটের চিত্রও তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সাল নাগাদ দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা হবে ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট। অথচ বর্তমানে দেশে বিদ্যমান সরকারি ক্যাবলগুলো থেকে জোগান পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ দশমিক ১ টেরাবিট। অর্থাৎ ২০২৬ সালেই দেশ ৬ দশমিক ৪ টেরাবিট ব্যান্ডউইথ ঘাটতির মুখে পড়বে।
সময়মতো নতুন ক্যাবল যুক্ত করা না হলে এ ঘাটতি ২০২৮ সালে বেড়ে ১৯ দশমিক ৯ টেরাবিটে দাঁড়াতে পারে। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলকে সবচেয়ে দ্রুত ও সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের কারণে এ ঘাটতি পূরণ করা না গেলে দেশে ইন্টারনেটের ধীরগতি ও উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, ব্যান্ডউইথ সংকটের প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে পড়ছে। উচ্চ পাইকারি মূল্যের কারণে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমছে না। এর ফলে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি রপ্তানি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে আইসিটি খাতে প্রায় ১৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার ঘোষিত এআই ডেটা সেন্টার বা আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি হাব হওয়ার পরিকল্পনাও এর ফলে ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বক্তারা।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া বক্তারা দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের আহ্বান জানান। তারা মনে করেন, ২০২৬ সালের আসন্ন সংকট মোকাবিলা করতে হলে এখনই বেসরকারি প্রকল্পটিকে সবুজ সংকেত দিতে হবে। প্রকল্পের কাজ যেহেতু অনেকখানি এগিয়ে গেছে, তাই কেবল প্রশাসনিক অনুমতির কারণে এটি আটকে থাকা দেশের জন্য বড় ক্ষতি।
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে এ প্রকল্পের বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা। নীতিনির্ধারকরা দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং সস্তা ইন্টারনেটের স্বপ্ন অধরাই থেকে যেতে পারে। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
কর্মশালায় সংগঠনের সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন।
