বিজ্ঞাপন

খৈয়াছড়ার পথে : কাদা-পানি পেরিয়ে ঝরনার অপার্থিব সৌন্দর্যে

খৈয়াছড়ার পথে : কাদা-পানি পেরিয়ে ঝরনার অপার্থিব সৌন্দর্যে

পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সরু একটি পথ। কোথাও কাদামাটি, কোথাও পিচ্ছিল পাথর, আবার কোথাও ঝিরির স্বচ্ছ পানির স্রোত। মাথার ওপর ঘন সবুজের ছাউনি। চারপাশে নীরব পাহাড়। সেই নীরবতা ভেঙে দূর থেকে ভেসে আসছে ঝরনার পানির শব্দ। কখনো গাছের শিকড় ধরে, কখনো রশি আঁকড়ে, আবার কখনো পাথর বেয়ে এগিয়ে যেতে হয়। মনে হতে পারে, এত কষ্ট করে আর কত দূর! কিন্তু সামনে ঝরনার শব্দ শুনলেই আবার পা বাড়াতে ইচ্ছে করে।

চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ঝরনার পথে এমন অভিজ্ঞতাই হয়। এটি এমন কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়, যেখানে গাড়ি থেকে নেমে কয়েক মিনিট হাঁটলেই ঝরনার দেখা মিলবে। খৈয়াছড়াকে দেখতে হলে পাহাড়ের ভেতর ঢুকতে হবে। পেরোতে হবে দুর্গম পথ। আর সেই কষ্টের পর যখন ঝরনার সামনে দাঁড়ানো যায়, তখন পথের ক্লান্তি অনেকটাই ভুলে যেতে হয়।

দুর্গম পথেই শুরু রোমাঞ্চ

খৈয়াছড়া ঝরনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর একাধিক ধাপ। প্রথম ধাপে পৌঁছাতেই অনেকের দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। পথের শুরুটা তুলনামূলক সহজ হলেও ধীরে ধীরে তা দুর্গম হয়ে ওঠে। কোথাও কাদামাটি, কোথাও পাথর, আবার কোথাও ঝিরির পানির মধ্য দিয়েই হাঁটতে হয়। বর্ষাকালে পথ আরও পিচ্ছিল হয়ে যায়।

ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় অনেক জায়গায় সূর্যের আলোও সরাসরি মাটিতে পৌঁছায় না। চারপাশে গাছপালা আর পাহাড়ের সবুজ। ঝিরির পানি পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার শব্দ পুরো পথজুড়ে এক ধরনের প্রশান্তি তৈরি করে।

তবে খৈয়াছড়ার পথে শারীরিক পরিশ্রম কম নয়। কিছু জায়গায় গাছের শিকড় ধরে ওপরে উঠতে হয়। কোথাও রশি ধরে শরীরের ভারসাম্য রাখতে হয়। আবার কোনো কোনো অংশে পাথর বেয়ে উঠতে হয়। তাই এই ভ্রমণে আরামদায়ক পোশাক ও হালকা ব্যাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম ঝরনার দেখা

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন প্রথম ঝরনার দেখা মেলে, তখন দৃশ্যটি সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা পানির ধারা পাথরের ওপর আছড়ে পড়ছে। চারপাশে সবুজের সমারোহ। ঠান্ডা পানির শব্দ আর পাহাড়ি বাতাসে মুহূর্তেই যেন শরীরের ক্লান্তি কমে যায়।

কেউ কেউ এখানেই কিছুক্ষণ সময় কাটান। কেউ ঝরনার পানিতে পা ভেজান, কেউ ছবি তোলেন। আবার যাঁদের শারীরিক সক্ষমতা ও সাহস আছে, তারা আরও ওপরে ওঠার প্রস্তুতি নেন।

ধাপে ধাপে আরও ওপরে

দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের দিকে ওঠার পথ তুলনামূলক বেশি খাড়া। এরপরের ধাপগুলোতেও সাবধানে চলতে হয়। কোথাও পাথর পিচ্ছিল, কোথাও ঢাল বেশ তীব্র। তাই ওপরের ধাপে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি।

তেরতম ধাপ পর্যন্ত যেতে পারলে অভিজ্ঞতাটি আরও অসাধারণ হয়ে ওঠে। ওপর থেকে নিচের দিকে তাকালে একের পর এক ঝরনার ধাপ, পাহাড়ের সবুজ আর পাথুরে পথ মিলে তৈরি হয় অপূর্ব এক দৃশ্য। তখন মনে হয়, এতক্ষণ যে কষ্ট করে পথ পাড়ি দেওয়া হয়েছে, এই দৃশ্য দেখার জন্য সেটুকু কষ্ট করাই যায়।

প্রকৃতির সৌন্দর্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য এখানেই। গন্তব্য যতটা সুন্দর, সেখানে পৌঁছানোর পথও ততটাই গল্প তৈরি করে।

সময়ের হিসাব জরুরি

খৈয়াছড়া ভ্রমণে সময়ের হিসাব খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ঝরনা পর্যন্ত যেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগতে পারে। ওপরের ধাপগুলোতে যেতে আরও কয়েক ঘণ্টা সময় দরকার হতে পারে। আবার ওপর থেকে নিচে ফিরতেও তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

তাই সকালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাত্রা শুরু করা ভালো। ঝরনা এলাকায় ছবি তোলা, বিশ্রাম ও খাবারের জন্যও সময় রাখতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় সন্ধ্যা দ্রুত নেমে আসে। তাই দিনের আলো থাকতেই ফেরার চেষ্টা করা উচিত।

সঙ্গে কী নেবেন?

খৈয়াছড়ায় যাওয়ার আগে পোশাকের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। আরামদায়ক ও হালকা পোশাক পরা ভালো। অতিরিক্ত ভারী ব্যাগ নেওয়া উচিত নয়। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার রাখা যেতে পারে।

ঝরনার পথে শুরুতেই কয়েকটি দোকান রয়েছে। সেখান থেকে বাঁশের লাঠি নেওয়া যায়। পিচ্ছিল পথে চলার সময় এটি ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। একটি লাঠির দাম আনুমানিক ৭০ টাকা হতে পারে।

কিছু দোকানে দুপুরের খাবার আগেই বুকিং দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোথাও পোশাক পরিবর্তন ও লকার ব্যবহারের সুবিধাও পাওয়া যায়। অতিরিক্ত জিনিসপত্র লকারে রেখে হালকা হয়ে ট্রেকিং করা বেশ সুবিধাজনক।

গাইড নেবেন কি?

পথ আগে থেকে ভালোভাবে জানা না থাকলে গাইড নেওয়া উপকারী হতে পারে। স্থানীয় দোকানগুলোর মাধ্যমে গাইডের ব্যবস্থা করা যায়। একটি দলের জন্য সাধারণত একজন গাইড নেওয়া হয়। পারিশ্রমিক আনুমানিক ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা হতে পারে।

গাইড থাকলে দুর্গম পথে কোথায় কীভাবে উঠতে হবে, কোন অংশে বেশি সতর্ক থাকতে হবে এবং তুলনামূলক সহজ পথ কোনটি—এসব জানা যায়।

জুতা না খালি পা?

খৈয়াছড়ার পথে পিচ্ছিল পাথর ও পানির কারণে সাধারণ জুতা বা স্যান্ডেল অনেক সময় সমস্যার কারণ হতে পারে। কেউ কেউ জুতা খুলে খালি পায়ে হাঁটেন। তবে এতে পায়ে আঘাত লাগার ঝুঁকি রয়েছে। তাই ভালো গ্রিপযুক্ত পায়ের সুরক্ষা ব্যবহার করা নিরাপদ।

ঢাকা থেকে খৈয়াছড়া

ঢাকা থেকে খৈয়াছড়া যেতে সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাজারে নামা যায়। সেখান থেকে সিএনজিতে খৈয়াছড়ার দিকে যাওয়া সম্ভব। জনপ্রতি ভাড়া আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ টাকা হতে পারে। দলবদ্ধভাবে গেলে পুরো সিএনজি রিজার্ভ করে যাওয়াও সুবিধাজনক।

তবে যাত্রার আগে বাস, সিএনজি ও অন্যান্য পরিবহনের বর্তমান ভাড়া এবং সময়সূচি জেনে নেওয়া ভালো।

সীতাকুণ্ডে আরও যা দেখবেন

শুধু খৈয়াছড়া দেখে সময় হাতে থাকলে সপ্তধারা, সহস্রধারা, নাপিত্তাছড়া, রূপসী ঝরনা, মহামায়া লেক, বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত, গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত ও সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ঘুরে দেখা যায়।

দুই বা তিন দিনের পরিকল্পনা করলে এসব গন্তব্য মিলিয়ে সুন্দর একটি ভ্রমণসূচি তৈরি করা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন