পৃথিবীর অত্যাধুনিক ও কম খরুচে এয়ারক্রাফট হিসেবে পরিচিত ফ্রান্সের এয়ারবাস। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাস ব্র্যান্ডের এয়ারক্রাফট কিনে নিজেদের বহর সমৃদ্ধ করছে। এবার বাংলাদেশের চোখ পড়েছে বিশ্বের অত্যাধুনিক এয়ারবাস ব্র্যান্ডের এয়ারক্রাফটের দিকে।

বিমান জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০টি এয়ারবাস ব্র্যান্ডের এয়ারক্রাফট কেনার পরিকল্পনা তাদের। এর মধ্যে দুটি কার্গো এবং আটটি যাত্রীবাহী বা প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট।

এয়ারবাস পৃথিবীর অন্যতম বড় বিমান সংস্থা, যারা বাণিজ্যিক এয়ারক্রাফটের নকশা, নির্মাণ ও বিপণন করে। এটি ইউরোপভিত্তিক এবং ফ্রান্স, ব্রিটেন ও স্পেনে তাদের বড় অফিস ও সংযোজন কারখানা রয়েছে। এয়ারবাসের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং। বর্তমানে বিমানের বহরে থাকা ২১টি এয়ারক্রাফটের মধ্যে ১৬টি বোয়িং ব্র্যান্ডের। এয়ারবাসের আরও ১০টি এয়ারক্রাফট আসলে এ সংখ্যা ৩১-এ দাঁড়াবে।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০টি এয়ারবাস ব্র্যান্ডের এয়ারক্রাফট কেনার পরিকল্পনা তাদের। এর মধ্যে দুটি কার্গো এবং আটটি যাত্রীবাহী বা প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট।

বিমানের এয়ারবাস কেনা নিয়ে যেসব তথ্য জানা গেছে

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে এয়ারবাসের দুটি কার্গো এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যা ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হবে। তবে বাকি আটটি এয়ারক্রাফট ধাপে ধাপে আসতে ২০২৮-২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

বিমান জানিয়েছে, এয়ারবাসের পক্ষ থেকে বিমানকে দুটি এ৩৫০-এফ মডেলের কার্গো বিমান কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তারা প্রতিটি এয়ারক্রাফটের জন্য ২০ কোটি মার্কিন ডলার করে চেয়েছে। তবে এ দাম চূড়ান্ত হয়নি। দুটি কার্গো কেনার আগে দর কষাকষি করা হবে। এয়ারবাসের এ৩৫০-এফ কার্গো বিমানটি ১০৯ টন ভার বহনে সক্ষম।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিমানের সর্বশেষ বোর্ড মিটিংয়ে তারা এয়ারবাস কেনার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কতগুলো কেনা হবে, সংখ্যাটা নির্দিষ্ট নয়। তবে, বোর্ড মিটিংয়ে একটা সম্ভাব্য সংখ্যা (১০) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব নিয়ে আমাদের টেকনিক্যাল কমিটি বসবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা এয়ারবাসের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমরা বিমানের বহরে এয়ারক্রাফটের সংখ্যা বাড়াতে চাই, এয়ারবাসও আমাদের এয়ারক্রাফট দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা (এয়ারবাস) আমাদের দুটি এয়ারক্রাফট বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে তাদের কাছ থেকে মোট ১০টি এয়ারক্রাফট কিনব বলে জানিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি মো. শফিউল আজিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিমানের ভবিষ্যতের বিষয় মাথায় রেখে আমরা ফ্লিট (এয়ারক্রাফট) বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তবে, এয়ারবাস কেনার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

যেভাবে বাংলাদেশে এয়ারবাসের যাত্রা শুরু

চলতি বছরের ২৩ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ এভিয়েশন সামিট-২০২৩ অনুষ্ঠিত হয়। সামিটে বাংলাদেশের পক্ষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান উপস্থিত ছিলেন। সামিটে এয়ারবাস ও প্রতিনিধিদল, ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন ও ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ম্যারি মাসডুপুই উপস্থিত ছিলেন। সামিটজুড়ে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত ও এ খাতকে অত্যাধুনিক করার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনা হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বহরে এয়ারবাস কেনার।

এয়ারবাস প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সালমান এফ রহমান সেসময় বলেছিলেন, ‘এয়ারবাস শুধু বাংলাদেশে ব্যবসা করার জন্য এসেছে, তা নয়। তারা আমাদের এভিয়েশন খাতে প্রযুক্তি বিনিময়ের পাশাপাশি শিক্ষা ও দক্ষতাবিষয়ক সহায়তাও দিতে চায়। এর মাধ্যমে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এভিয়েশন খাত নিয়ে যোগাযোগ আরও গভীর হবে। এয়ারবাসের সঙ্গে সহযোগিতা সরকারের সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।’

সর্বশেষ মে মাসের ৫ তারিখ এয়ারবাস থেকে যাত্রীবাহী ও কার্গো বিমান কেনাসহ বাংলাদেশের এভিয়েশন (বিমান চালনা) খাতের উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে একটি জয়েন্ট কমিউনিকে স্বাক্ষর করা হয়। বাংলাদেশের সালমান এফ রহমান ও যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগমন্ত্রী লর্ড ডমিনিক জনসন জয়েন্ট কমিউনিকে স্বাক্ষর করেন।

জয়েন্ট কমিউনিকে স্বাক্ষর শেষে সন্তোষ প্রকাশ করে সালমান এফ রহমান বলেন, এ উদ্যোগের ফলে এয়ারবাস ও বাংলাদেশ বিমানের মধ্যে দীর্ঘ ও কার্যকর সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বর্তমান সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ডমিনিক জনসন টুইটে বলেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর শক্তিশালী করবে এ জয়েন্ট কমিউনিকে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্প শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি উভয় দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বছরের শুরুতে এয়ারবাস আনার ঘোষণা দেয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

রাষ্ট্রীয়ভাবে মার্চে এয়ারবাস নিয়ে আলোচনা হলেও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এয়ারবাস আনার ঘোষণা দেয় বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স জানায়, এয়ারবাস এ-৩৩০ ফ্লাইটে বাংলাদেশি হজ, ওমরাহ পালনকারী ও প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মামসহ ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বহরে বর্তমানে আটটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও আটটি এটিআর ৭২-৬০০সহ মোট ১৯টি এয়ারক্রাফট আছে। চলতি বছর দুটি এয়ারবাস ৩৩০ এয়ারক্রাফটসহ আরও দুটি এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এআর/এমএআর