২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘ঘ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক চলছে। অনুষদ না চাইলেও বিষয়টি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকদের।

তারা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত ১৯৭৩ সালের ভর্তি সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ডিনস কমিটি এটি বাতিল করতে পারেন না। একইসঙ্গে ভর্তি পরীক্ষায় এই ইউনিট থাকলে শিক্ষার্থীদেরই লাভ বলে অভিমত এ শিক্ষকদের।

ইতোমধ্যে ইউনিটটি পুনর্বহালের দাবিতে গতকাল (১৪ ফেব্রুয়ারি) কমিটি গঠন করেছে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দল। অনুষদের ডিন অধ্যাপক জিয়া রহমানকে আহ্বায়ক করে নীল দল, সাবেক ডিন, প্রভোস্ট ও অনুষদের অন্যান্য শিক্ষকদের সমন্বয়ে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এছাড়া একই দাবিতে ১৩ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম ‘সর্বদলীয় আন্দোলন কমিটি’ গঠন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ.ক.ম জামাল উদ্দিন। এ কমিটিতে অনুষদের আওয়ামী লীগ সমর্থক নীল দল এবং বিএনপি সমর্থক সাদা দলসহ শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছিল।

এ দুটি কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ইউনিটটি বাতিল কোনোভাবেই মেনে নেবেন না তারা। তাদের দাবি, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ১৬টি বিভাগের কেউই শুরু থেকেই চাননি এটি বাতিল হোক। অনুষদ ও বিভাগের মতামতকে অগ্রাহ্য করে এটি বাতিল করা হয়েছে।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নীল দলের আহ্বায়ক ও পুনর্বহালের দাবিতে গঠিত কমিটির সদস্য ড. মো. রফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সব শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা জানে যে প্রচলিত ইউনিটগুলোর বাইরে একটি ইউনিট আছে। তারাও সেভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়। এখন এটা বন্ধ করে দিলে ছাত্রদেরই সুযোগ কমে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যারা সন্তান তারাও বিভিন্ন ইউনিটের পাশাপাশি 'ঘ' ইউনিটে পরীক্ষা দেয়। 'ঘ' ইউনিট থাকা না থাকার যে প্রশ্নটি এসেছে আমার দৃষ্টিতে থাকাটা সবারই লাভ। একজন শিক্ষার্থী যেকোন কারণে হয়ত তার নিজের ইউনিটে পরীক্ষা দিয়ে টিকতে নাও পারে কিংবা অসুস্থতা থাকতে পারে। তার জন্য দ্বিতীয় একটা সুযোগ হচ্ছে এই ইউনিট। এটি বাতিল করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে। এমন একটা প্রতিষ্ঠিত ইউনিটকে আমরা কেন তুলে দিচ্ছি, এতে আমাদের লাভ কী এসব বিষয়ে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করব। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে ছাত্রদের মঙ্গলের জন্য 'ঘ' ইউনিট থাকতে হবে।

অধ্যাপক আ.ক.ম জামাল উদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ এর অর্ডারে ভর্তি সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বলা আছে, স্ব-স্ব বিভাগ তাদের ভর্তি সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন করবে। সেই আলোকে ২০২০ সালে আমাদের অনুষদের ১৬টি বিভাগ সভা করে ঘ ইউনিট বহাল রাখার সুপারিশ উপাচার্য ও ভর্তি কমিটি বরাবর পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে অনুষদের এ সুপারিশ সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে, কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘ ইউনিট বাতিল করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এ সিদ্ধান্ত ১৯৭৩ সালের ভর্তি সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সে কারণে কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত অবৈধ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, যে প্রক্রিয়াতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে প্রক্রিয়াটা যথাযথ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশের নিয়ম অনুযায়ী যেভাবে নেওয়া উচিত সেটাকে বিবেচনা না করে, ডিনস কমিটি তাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ ডিনস কমিটি আমাদের ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশের মধ্যে বিরাজই করে না। ভর্তি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ডিনস কমিটি দিতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, 'ঘ' ইউনিটের মাধ্যমে যারা ভর্তি হয় তাদের বড় অংশই সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তি হয়। যার ফলে আমাদের মতামতটা খুব জরুরি, কিন্তু আমাদের কোনো মতামতই নেওয়া হয়নি। বলা হচ্ছে এটি একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কীভাবে হয়েছে আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম তারা কেউ স্পষ্ট না। এটা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো আলোচনায় হয়নি। এছাড়া ডিনস কমিটিতেও যখন এটি প্রথম উত্থাপন করা হয়েছিল প্রথম তখন এটি মূল এজেন্ডাতেই ছিল না।

শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের একটা অভিজ্ঞতা আছে, চর্চা আছে। এসব বিবেচনায় আলাদা একটা স্বতন্ত্র ইউনিট থাকা যুক্তিসঙ্গত। এর আগে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সব বিভাগের একাডেমিক কমিটি থেকে এটা রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে পাঠানো হয়েছিল, ফ্যাকাল্টি কমিটি থেকেও এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। কিন্তু ডিনস কমিটি এটাকে অন্যভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং 'ঘ' ইউনিট পুনর্বহালের দাবিতে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা ঘ ইউনিট রাখার পক্ষে। সে পরিপ্রেক্ষিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য এবং বুঝানোর জন্য।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির একটি বিশেষ সভা হয়। আলোচ্য সূচিতে না থাকলেও সেই সভার শেষ পর্যায়ে নিজে থেকেই ঘ ইউনিট ও চারুকলা অনুষদভুক্ত চ ইউনিট বন্ধ করার প্রস্তাব তোলেন উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান। উপাচার্যের সেই প্রস্তাবে আইন অনুষদের ডিন মো. রহমত উল্লাহ ও কলা অনুষদের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিন আবু মো. দেলোয়ার হোসেন সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিন সাদেকা হালিম প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছিলেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক সাদেকা হালিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ডিনস কমিটিতে বিষয়টি আলোচনা হয়েছিল, আমাকে বলা হচ্ছিল সমন্বয় করতে। আমি বলেছিলাম এটা সমন্বয় করলেও ফ্যাকাল্টিতে আলোচনা করতে হবে। এভাবে তো আপনারা চাপিয়ে দিতে পারেন না। ডিনস কমিটি এটা সিদ্ধান্তও নিতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেবে একাডেমিক কাউন্সিল, কিন্তু সেখানেও আলোচনা হয়নি। এটা বাতিলের পক্ষে আমি চরম বিরোধিতা করেছিলাম। আমি বলেছিলাম সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকেরা নিজস্ব পরীক্ষা চান। এ অনুষদের জন্য স্বতন্ত্র ইউনিট হওয়া উচিত।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ভর্তি কমিটির সভা শেষে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক আগামী ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তিতে ক, খ, গ ও চ এই চার ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। অর্থাৎ ঘ ইউনিট থাকছে না।

এছাড়া সভায় বিভাগ পরিবর্তনের বিকল্প কৌশল বের করার জন্য ডিনস সাব-কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা তৈরির কাজ চলমান বলে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন এ কমিটির প্রধান কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির।

পরীক্ষার বোঝা ও ভোগান্তি লাগবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির সভার পর সাধারণ ভর্তি কমিটির সভার সুপারিশের ভিত্তিতে একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় 'ঘ' ইউনিট বাতিলের সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।

এইচআর/এসএম