রাতুল ও তার পরিবার

খালি কন্টেইনার থেকে মালয়েশিয়ার কেলাং বন্দরে উদ্ধার হওয়া কিশোর রাতুল ইসলাম ফাহিম ও তার পরিবার বসবাস করে ছোট্ট এক ঝুপড়ি ঘরে। মাথার ওপরে পাতলা টিন আর ত্রিপল দিয়ে চারপাশ মোড়ানো ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে শুধু কয়েকটি বাঁশের খুঁটির ভরসায়। ভূমিহীন এ পরিবারের ৫ সদস্যের সেই ঘরেই চলে রান্না-ঘুম। মাটিতে কাঁথা-কাপড় বিছিয়ে কোনোরকম রাত্রিযাপন করেন তারা।

শনিবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ঝলম দক্ষিণ ইউনিয়নের সাত পুকুরিয়া এলাকার বাসিন্দা ও রাতুলের বাবা ফারুক হোসেনের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। এ সময় তিনি তার দুর্বিষহ জীবনের নানান অধ্যায় তুলে ধরেন।

মানসিক প্রতিবন্ধী রাতুল ইসলাম ফাহিমের বাবা ফারুক হোসেন একজন দিনমজুর। ২০০৬ সালে কর্মের সন্ধানে ছোটভাই আজগর আলীকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যান ফারুক। সেখানে গিয়ে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজে যোগ দেন। ২০১৪ সালে ফারুক হোসেনের বাবা সেলিম মিয়া মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রাম থেকে তারা কুমিল্লায় ফিরে আসেন আপন ভিটায়। এসে দেখেন তার বাবা মারা যাওয়ার আগে চাচাদের কাছে সকল সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে দুই ভাই ফারুক ও আজগর সুদে, কিস্তিতে, ধারদেনা করে ৪ লাখ টাকা দিয়ে চাচার কাছ থেকে সামান্য একটু জায়গা কিনে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন। ছোটভাই আজগর আলী তার অংশে দোচালা টিনের ঘর করতে পারলেও বড়ভাই ফারুকের পক্ষে সেটুকুও করা হয়ে ওঠেনি। ফারুক তার ৩ ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনোরকম বেঁচে আছেন ছোট্ট একটি একচালা ঘরে। সেই ঘরের চালায় টিন থাকলেও বাঁশের খুঁটি আর ত্রিপলের বেড়াই একমাত্র ভরসা। ৩ সন্তান, স্ত্রী আর নিজেরসহ ৫ জনের ভরণপোষণ ফারুক হোসেনের কাঁধে।

এই ঘরেই বসবাস রাতুল ও তার পরিবারের 

তিন সন্তানের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী রাতুল সবার বড়। মেজো ছেলে রিফাত ইসলামের বয়স ১০ এবং ছোট ছেলে আসিফ ইসলামের বয়স ৮ বছর। রিফাত ও আসিফ স্থানীয় একটি ব্র্যাক স্কুলে পড়লেও বড় ছেলে রাতুল মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় স্কুলে যায় না। মাঝে মাঝেই সে ঠিকমতো ঘরে ফেরে না। গত মাস দুয়েক আগে এক শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় রাতুল। সেদিন রাতে বাড়ি না ফেরায় দুশ্চিন্তায় পরে যান বাবা ফারুক ও মা রোকেয়া। এভাবে একদিন-দুইদিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে যায় কিন্তু রাতুল ফিরে না আসায় ছেলের শোকে পাগলের মতো হয়ে যান ফারুক-রোকেয়া দম্পতি। 

১৭ জানুয়ারি টেলিভিশনে রাতুলের ছবি দেখে ছেলেকে শনাক্ত করেন ফারুক হোসেন। গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেটিকে ফিরে পেতে আকুতি জানিয়েছেন এই দম্পতি।

ইউপি সদস্য মো. শহিদুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, টিভিতে রাতুলের ছবি দেখে তার বাবা ফারুক মিয়া আমার কাছে আসে। আমিও ভালো করে দেখে নিশ্চিত হই এটা ফারুকের ছেলে রাতুল। এই পরিবার খুবই দরিদ্র। আমরা রাতুলকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে এনে দিতে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। 

প্রসঙ্গত, গত ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া ‘এমভি ইন্টেগ্রা’ জাহাজের একটি খালি কনটেইনারে আটকা পড়ে রাতুল। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) মালেশিয়ার কেলাং বন্দরে জাহাজের একটি খালি কনটেইনারের ভেতর থেকে শব্দ শুনতে পান নাবিকরা। এরপরই কেলাং বন্দরকে জানানো হয়। পরদিন বুধবার (১৭ জানুয়ারি) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় জাহাজটি জেটিতে এনে কন্টেইনার খুলে মানসিক প্রতিবন্ধী কিশোরকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে রাতুল মালয়েশিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। 

আরিফ আজগর/আরকে