মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ীতে শুক্রবার (১২ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পদ্মা নদীতে গোসল করতে নেমেছিলেন ৩০-৩৫ জন। অল্প পানিতেই গোসল করছিলেন তারা। হঠাৎ করে এক শিশু পা পিছলে পড়ে গেলে তাকে উদ্ধার করতে যান মোট ৭ জন। পা পিছলে যাওয়া শিশুকে উদ্ধার করে চারজন ফিরে এলেও নিখোঁজ হন বাবা-ছেলেসহ তিনজন। নিখোঁজ তিনজনের মধ্যে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে এক কিশোর। 

নিহতরা হলেন- ঢাকার মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোড এলাকার বাসিন্দা রেলওয়ের প্রকৌশলী রিয়াদ আহমেদ রাজু (৪৫) ও তার ভায়রা জুয়েল রানা (৪০)। নিখোঁজ রয়েছে রাজুর ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র আরিফ আহমেদ (১৬)। জুয়েল একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন।

নিহত রিয়াদ আহমেদ রাজুর চাচার বাড়ি টংগিবাড়ী উপজেলার বেসনাল গ্রামে গিয়ে জানা গেছে, নিহত রেলওয়ে কর্মকর্তা রিয়াদ আহমেদ রাজু টংগিবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের হারুন রশিদ মোল্লার একমাত্র ছেলে। তাদের দিঘীরপাড় গ্রামের বাড়ি প্রায় দুই যুগ আগে পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরে তারা ঢাকার মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোড এলাকার বসবাস করে আসছিলেন। এ বছর হজ করতে সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল রাজুর। সে উপলক্ষ্যে চাচা ইকবাল হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে বেশনাল গ্রামের  বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে তিনিসহ তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন মিলে ৩০ থেকে ৩৫ জন চাচার বাড়িতে এসে পৌঁছান। পদ্মা নদীতে ঘুরা শেষে সন্ধ্যায় ঢাকায় ফেরার কথা ছিল তাদের।

অন্যান্য আত্মীয়ের সঙ্গে রিয়াদ আহমেদ রাজুর স্ত্রী, তার তিন ছেলে ও তার ভায়রা ওয়ান ব্যাংকের কর্মকর্তা জুয়েল রানা ও তার স্ত্রী, দুই ছেলেসহ মোট ৩০-৩৫ জন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ইকবাল হোসেনের বাড়ি থেকে বের হন। পরে তারা দিঘীরপাড় এলাকার পদ্মা নদীর ঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া নিয়ে প্রথমে হাসাইল বাজার এলাকায় যান। পরে হাসাইল থেকে ফিরে উপজেলার ধানকোড়া এলাকার পদ্মা নদীর চরে নামেন। পদ্মার চরে নেমে তারা পাশের নদীতে তিনজন‌ ছাড়া বাকি সবাই গোসল করতে নামেন। এ সময় অল্প পানিতেই তারা গোসল করছিলেন। হঠাৎ করে এক শিশু পদ্মা নদীর মধ্যে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে তাকে উদ্ধার করতে যান সাতজন।  এদের মধ্যে ওই শিশুকে উদ্ধার করে চারজন ফিরে আসলেও নিখোঁজ হন রিয়াদ আহমেদ রাজু, তার ছেলে আরিফ ও ভায়রা জুয়েল রানা। পরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আরিফ। 

এদিকে নদীর পানি প্রচণ্ড ঠান্ডা হওয়ার কারণে রাত ১০টার দিকে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়। শনিবার (১৩ এপ্রিল) আবার উদ্ধার অভিযান চালানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নিহত রিয়াদ আহমেদ রাজুর ফুফু নাসিমা বেগম বলেন, রাজুর এ বছর হজ্জ করতে যাওয়ার কথা। এজন্য ও ঢাকা থেকে আমাদের বাড়িতে আসছিল। দুপুরে আমি নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দিলাম। ঢাকা থেকে ১১টার দিকে আসার পর ফল খেলো। দুপুরে ইলিশ মাছ দিয়ে নিজ হাতে ভাত খাওয়াইলাম তারপরে আর পাইলাম না। ও যাওয়ার সময় কইয়া গেল নদী থেকে ঘুইরা আইসা ঢাকা চইলা যাইবো। এখন লাশ হইয়া গেল।

প্রত্যক্ষদর্শী বিথী বলেন, আমরা ৩০-৩৫ জন বিকেল পৌনে ৪টার দিকে বাড়ি থেকে বের হই। রাজু ভাই, তার স্ত্রী, তিন ছেলে, জুয়েল রানা ভাই, তার স্ত্রী ও দুই ছেলে আমাদের সাথে ঘুরতে যায়। দিঘীরপাড় ট্রলার ঘাট হতে ট্রলার নিয়ে আমরা প্রথমে হাসাইল যাই। পরে হাসাইল থেকে ফিরে আমরা পদ্মা নদীর চরে ট্রলার ভিড়িয়ে নামি। নেমে আমরা তিনজন ছাড়া সবাই হাঁটুপানি কোমর পানিতে গোসল করতে ছিল।  জুয়েল রানার ছেলে রাইতা খেলা করতে নেমে পানিতে পড়ে যায়। তাকে বাঁচাতে মোট সাতজন গেলে তাকে নিয়ে আমার ভাই মিথুন ফিরে আসলেও  রাজু ভাই, তার বড় ছেলে আরিফ ও জুয়েল রানা ভাই তিনজনই নিখোঁজ হন। রাজু ভাই এবং জুয়েল রানা ভাই আপন ভায়রা। তাদের শ্বশুরবাড়ি ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায়।

তিনি আরও বলেন, রাইতাকে উদ্ধার করতে যে সাতজন গিয়েছিল এদের মধ্যে তিনজন মেয়ে ও চারজন ছেলে ছিল। আমার আপন ভাই মিথুন রাইতাকে উদ্ধার করে চলে আসে। তিনজন মেয়েও চলে আসে। কিন্তু অপর তিনজন পুরুষ নিখোঁজ হয়। 

ঘুরতে যাওয়া সাদিয়া বলেন, আমরা ট্রলার নিয়ে যারা ঘুরতে গেছিলাম তাদের মধ্যে ১৫ জনই শিশু ছিল। অনেক নারীও ছিল। পুরুষের সংখ্যা কম ছিল। নারী ও শিশুরাই বেশি ছিল । প্রত্যেকেই কমবেশি সাঁতার জানতো। তারপরও একে অপরকে ধরে জড়াজড়ি করার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

টংগিবাড়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ মোস্তফা কামাল জানান, খবর পেয়ে আমাদের টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। উদ্ধার অভিযানের কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করি। এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছে। নদীর পানি প্রচণ্ড ঠান্ডা হওয়ায় রাত ১০টার দিকে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার আবার উদ্ধার অভিযান চলবে।

ব.ম শামীম/আরএআর