বাম্পার ফলনেও ন্যায্য মূল্য নেই সবজির, দুশ্চিন্তায় সুবর্ণচরের কৃষকরা
নোয়াখালীর শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত সুবর্ণচর উপজেলায় চলতি শীত মৌসুমে সবজির উৎপাদন আশাব্যঞ্জক হলেও কাঙ্ক্ষিত ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশায় পড়েছেন কৃষকরা। আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করে লাভের স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবতায় অনেক চাষিকেই পড়তে হচ্ছে লোকসানের মুখে।
সম্প্রতি উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে বাম্পার ফলনের চিত্র। বিস্তীর্ণ জমিতে লাউ, শশা, শিমসহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজির সবুজ সমারোহ চোখে পড়ে। তবে এই সমৃদ্ধ দৃশ্যের আড়ালে কৃষকদের মুখে নেই তৃপ্তির হাসি। কারণ, উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়লেও বাজারে সবজির দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
বিজ্ঞাপন
বাম্পার ফলন সত্ত্বেও ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে সুবর্ণচরের কৃষকদের চোখে এখন শুধুই হতাশা ও অনিশ্চয়তা। কৃষকের মুখে হাসি ফেরাতে কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো প্রত্যাশা জানাচ্ছেন স্থানীয় কৃষক সমাজ।
কৃষকদের দাবি, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত বাজার তদারকি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিপণ্যের আধুনিক সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে সবজি চাষে আগ্রহ হারাবেন কৃষকেরা, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও অর্থনীতিতে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় কৃষক আবুল বাশার ঢাকা পোস্টকে বলেন, এক বিঘা জমিতে সবজি চাষ করতে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিক মিলিয়ে অনেক টাকা খরচ করেছি। এখন বাজারে লাউ ও শশার যে দাম, তাতে খরচই উঠছে না। লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হচ্ছে।
আরেক কৃষক আলমগীর সওদাগর ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগাম সবজি করলে ভালো দাম পাওয়া যায় এই আশায় চাষ করেছিলাম। কিন্তু এবার বাজারে সবজি উঠতেই দাম পড়ে গেছে। তার ওপর কীটনাশকের দাম অনেক বেশি, অথচ আগের মতো কাজও করছে না। উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু বিক্রির দাম বাড়ছে না।
কৃষকদের অভিযোগ, সম্প্রতি কীটনাশকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় একাধিকবার স্প্রে করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত ফলন ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে। অথচ বাজারে সবজির ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
কৃষক আব্দুর রহিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে একবার স্প্রে করলেই পোকা দমন হতো, এখন দুই-তিনবার স্প্রে করেও কাজ হয় না। কীটনাশকের দাম বেশি, প্রতিদিনই খরচ বাড়ছে। অথচ বাজারে সবজির দাম এত কম যে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কৃষক মজিবুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, কীটনাশক ঠিকমতো কাজ না করায় ফসল বাঁচাতে বারবার ওষুধ দিতে হচ্ছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, লোকসানের আশঙ্কাই বাড়ছে। ন্যায্য দাম না পেলে ভবিষ্যতে সবজি চাষ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় সবজি বেপারী মো. সিরাজ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে সবজির সরবরাহ বেশি। পাইকারি বাজারে দাম কম থাকায় আমাদেরও কম দামে কিনতে হচ্ছে। যেখানে প্রতিদিন দাম বাড়ার কথা, সেখানে উল্টো প্রতিদিনই দাম কমে যাচ্ছে। পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বাদ দিলে খুব একটা লাভ থাকে না।
অপর বেপারী মো. রহমত উল্যাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ বছর মাঠে সবজির ফলন খুব ভালো হয়েছে। চারদিকে লাউ, শশা ও শিমে ভরে গেছে ক্ষেত। কিন্তু এত উৎপাদন হলেও বাজারে কোনো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। যে দামে সবজি বিক্রি করছি, তাতে ক্ষেতের কর্মচারীর মজুরি পর্যন্ত ওঠে না। সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ মেটানো তো দূরের কথা, অনেক সময় ধার করে চাষ চালাতে হচ্ছে। উপরন্তু আমাদের এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকায় বাজারে সবজি নিতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা, পরিবহন সুবিধা ও সরকারি নজরদারি না থাকলে কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. হারুন অর রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বরাবরের মতো এবারও আগাম সবজি উৎপাদনে সুবর্ণচর উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। যদিও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যাশিত দামের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে, তবে সামনে ভালো দাম পাওয়া যাবে বলে আমরা আশাবাদী। আমরা সবসময় কৃষকদের জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করে আসছি। পাশাপাশি কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
হাসিব আল আমিন/এআরবি