১৮ মাস পর কবর থেকে তোলা হলো সেই ইমতিয়াজের মরদেহ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নোয়াখালীর চাটখিল থানা থেকে লুট করা অস্ত্রে প্রাণ হারানো মো. ইমতিয়াজ হোসেন রিয়াজের মরদেহ আদালতের নির্দেশে ১৮ মাস পরে কবর থেকে তোলা হয়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে চাটখিল উপজেলার হাটপুকুরিয়া ঘাটলাবাগ ইউনিয়নের পারিবারিক কবরস্থান থেকে তার মরদেহ উত্তোলন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ইমতিয়াজ হোসেন রিয়াজ চাটখিল উপজেলার হাটপুকুরিয়া ঘাটলাবাগ ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের ওয়ারী মিয়া বেপারী বাড়ির মো. হাবিবুর রহমানের ছেলে। ইমতিয়াজ কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করতেন।
জানা যায়, পেশায় ছিলেন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি ম্যান। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের খবরে চাটখিল থানায় ঢুকে লুট করে নিয়ে আসেন অস্ত্র। পুলিশের অস্ত্র নিজের কোমরে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে স্থান ত্যাগের সময় পথিমধ্যে আত্মঘাতী বুলেট লাগে তার পায়ে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তবে পরিবারের দাবি থানা লুট নয় অজ্ঞাত ব্যক্তির অস্ত্রের গুলিতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে প্রাণ যায় রিয়াজের। পরবর্তীতে শাহাদাতের স্বীকৃতি ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে অর্থ আদায় করলে বিরোধিতা করে তার উপজেলার ছাত্র প্রতিনিধিরা। বন্ধ হয়ে যায় সরকারি সহযোগিতা। ছেলেকে জুলাই শহীদ দাবি করে মৃত্যুর ৯ মাস পর মামলা দায়ের করে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে, ২৭ মার্চ ইমতিয়াজ হোসেন রিয়াজকে শহীদের স্বীকৃতি ও ১০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্র দেওয়ায় ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। গেজেটভুক্ত শহীদের তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে তারা সংবাদ সম্মেলন করে ইমতিয়াজের পরিবারকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চাটখিল উপজেলার প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম রনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা অবাক হয়েছি কীভাবে একজন আত্মঘাতী ব্যক্তি শহীদ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়। আবার জেলা প্রশাসক ১০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্র তুলে দেন। আমরা বিষয়টির প্রতিবাদ জানাচ্ছি। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে ইমতিয়াজের নাম কোথাও ছিল না। তারপরও কীভাবে এতদূর গড়িয়েছে তার জন্য তদন্ত করা দরকার। এ ছাড়া, তারা জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে ৮ লাখ টাকা পেয়েছেন বলে জেনেছি। তার বাবা ছেলের মরদেহ নিয়ে রাজনীতি খেলেছে৷ আমরা তার বাবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
গোলাপ হোসেন ফরহাদ নামের আরেক শিক্ষার্থী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইমতিয়াজের মৃত্যুকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করে তার বাবা হাবিবুর রহমান সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, যা অনৈতিক। মামলার ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় ও বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করলে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়। এটি প্রকৃত শহীদদের অপমান ও রাষ্ট্রীয় সুযোগের অপব্যবহার। আমরা ঘটনার কঠোর তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দাবি করছি।
তৎকালীন চাটখিল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের শহীদের স্বীকৃতির বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যাচাই-বাছাইয়ে ইমতিয়াজের নাম বাদ যায়। যে যে ক্রাইটেরিয়াতে (মানদণ্ড) শহীদের স্বীকৃতি পাওয়া যায় তার ভেতরে সেটি পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইমতিয়াজের বাবা হাবিবুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। আমি মামলা করেছি। তবে আমার সুযোগ-সুবিধা বন্ধ আছে। আমি ন্যায় বিচার চাই।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি বিভাগে আহত অবস্থায় প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ইমতিয়াজ বলেছিলেন, বন্ধুদের কেউ একজন তাকে গুলি করেছে। স্থানীয় লোকদের অভিযোগ, থানা থেকে লুট করা অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার সময় আত্মঘাতী বুলেটে বিদ্ধ হয়েছিলেন ইমতিয়াজ।
স্থানীয় ছাত্র প্রতিনিধি ইশতিয়াক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইমতিয়াজের আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ, ছবি বা ভিডিও এখন পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আনন্দ মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় চাটখিল থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটের ঘটনার পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ইমতিয়াজকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। সাড়ে ৯ মাস পর ২০২৫ সালের ২১ মে ইমতিয়াজের বাবা ৫৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবেই মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। নিহতের দুই মাস পর তাকে জুলাই শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমরা প্রতিবাদ করেছি এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ করে যাব।
মরদেহ উত্তোলনের সময় উপস্থিত চাটখিল পৌরসভার বিএনপির ৭ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি লোকমান হোসেন বলেন, আমি যতটুকু শুনেছি, মুন্সিরাস্তায় আমার বাড়ির পাশের একটি খালি ভিটায় গুলিতে মৃত্যুবরণ করে ইমতিয়াজ। সেখানে ভিন্ন কেউ উপস্থিত ছিল কিনা, এমন তথ্য জানা নেই। তবে সেখানে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না।
চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল মোন্নাফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইমতিয়াজে বাবার করা মামলার তদন্তের জন্য আদালতের নির্দেশে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন করা হয়। মরদেহ ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য নোয়াখালী জেলা সদরে প্রেরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহাদত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য আদালতের নির্দেশে এই মরদেহ উত্তোলন করা হয়। আমরা হাড়গোড় এবং খুলিসহ যা পেয়েছি তা ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করেছি। অনেকদিন হয়েছে তা দেহাবশেষ তেমন কিছু ছিল না।
মরদেহ উত্তোলনের সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চাটখিল থানার উপপরিদর্শক আলমগীরসহ স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
হাসিব আল আমিন/এএমকে