গভীর রাত। সাগরের গর্জন আর হাড়কাঁপানো শীতল হাওয়ায় যখন জবুথবু চট্টগ্রামের সাগরপাড়ের জেলেপল্লীগুলো, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে সেখানে হাজির হলেন জেলার অভিভাবক। কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই দুর্গম আকমল আলী ঘাট ও রানী রাসমনির ঘাট এলাকায় নিজ হাতে শীতার্তদের গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে ভোর পর্যন্ত আকমল আলী ঘাট, রানী রাসমনির ঘাট, উত্তর কাট্টলী জেলেপল্লী এবং সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় ভাসমান ও অসহায় প্রায় ৫০০ মানুষের মাঝে এই শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।

আবেগাপ্লুত জেলেরা জেলেপল্লীর বাসিন্দা বেবি দাসের স্বামী সাগর দাস আগে মাছ ধরলেও এখন অটোরিকশা চালান। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে বেবি স্থানীয় ছোটখাটো অনুষ্ঠানে গান গেয়ে থাকেন। গভীর রাতে ডিসিকে পাশে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, আমি শীতে কাঁপছিলাম। ডিসি স্যার যখন মোটা একটা কম্বল পরিয়ে দিলেন, হঠাৎ সারা শরীরে উষ্ণতা অনুভব করলাম। আমাদের মতো গরিব মানুষের কাছে এর আগে কোনো ডিসিকে এভাবে নিজ হাতে কম্বল পরিয়ে দিতে দেখিনি।

উত্তর কাট্টলী জেলেপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা সমীরণ দাস বলেন, শহরতলীতে থাকলেও আমাদের দিকে তাকানোর যেন কেউ নেই। রাত দেড়টায় ডিসি স্যার নিজে এসে কম্বল দিয়ে গেছেন। উনার এই মানবিক কাজ আমাদের মন ছুঁয়ে গেছে।

সন্তানদের সুশিক্ষার প্রতিশ্রুতি বিতরণকালে জেলেরা তাদের সন্তানদের জন্য ভালো স্কুলের আবেদন জানালে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যেক জেলের কাছ থেকে সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন।

জেলেদের উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জেলেদের জীবনমান পরিবর্তন করতে হবে। বাপ-দাদার পুরনো জীবনধারায় আর চলা যাবে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বনির্ভর হতে হবে। সরকার আপনাদের টেকসই জীবনমান নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে।

অসহায় নারীর পাশে ডিসি জেলেপল্লী থেকে ফেরার পথে সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় তিন সন্তান নিয়ে শীতে কষ্ট পাওয়া নূর কায়াস নামে এক নারীর দেখা পান জেলা প্রশাসক। এসময় একটি শিশু প্রচণ্ড কাঁপছিল। বিষয়টি নজরে এলে ডিসি তাৎক্ষণিকভাবে খাবারের জন্য আর্থিক সহায়তা দেন এবং তার বড় সন্তানের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দীন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাইফুল্লাহ মজুমদারসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এমএএস