আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ উঠেছে। জেলা বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা অভিযোগ জানানো হয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কাছে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলী অভিযোগ করে বলেছেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নিয়োজিত প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতাকর্মী কিংবা সমর্থক।

এ বিষয়ে তিনি গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

লিখিত অভিযোগে মো. পয়গাম আলী বলেন, এই ধরনের দলীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দিয়ে কোনোভাবেই নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

এর আগে, একই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।

তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত কর্মকর্তাদের প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভোটের স্বচ্ছতার জন্য বড় ধরনের হুমকি।

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মৌখিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন।

নির্বাচনের আগেই একই আসনে ভোট পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ উঠে আসায় প্রশ্ন উঠছে যাদের হাতে ভোটের ব্যালট, তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে?

ভোটাররা জানান, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না এলে ভোটারদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শহরের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ভোট মানেই শুধু ব্যালট নয়, এটা মানুষের অধিকার। আমরা চাই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নির্ভয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। কিন্তু যারা ভোট পরিচালনা করবেন, তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে যদি প্রশ্ন থাকে, তাহলে সেই আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। প্রশাসনের উচিত আগেভাগেই সব অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

গোয়ালপাড়ার ভোটার সুমন বলেন, নির্বাচনের আগেই যখন বারবার কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ আসছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়। আমরা রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু বুঝি সুষ্ঠু ভোট হলে দেশের জন্য ভালো। তাই প্রশাসনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তারা বিষয়গুলো পরিষ্কার করবে এবং কোনো পক্ষ যেন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করবে।

এক তরুণ ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা নতুন প্রজন্ম ভোটের প্রতি আগ্রহ হারাতে বসেছি, কারণ আগের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। এবার যদি কর্মকর্তারা সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ থাকেন, তাহলে তরুণরা আবার ভোটের ওপর আস্থা ফিরে পাবে। না হলে ভোটকেন্দ্র বিমুখতা আরও বাড়বে।

এক নারী ভোটার বলেন, ভোট সুষ্ঠু হলে নারী ভোটাররাও নিরাপদ বোধ করেন। কিন্তু আগে থেকেই যদি অনিয়মের কথা শোনা যায়, তাহলে অনেকেই কেন্দ্রে যেতে ভয় পান। প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ, ভোটের পরিবেশ যেন নিরাপদ ও নিরপেক্ষ হয়।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) ইশরাত ফারজানা বলেন, আমরা নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি এবং নিশ্চিত করতে চাই, যে ভোট প্রক্রিয়া সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ হবে। নির্বাচন-সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ভোটারদের আস্থা বজায় রাখা আমাদের মূল দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, আশা করছি, সব পক্ষের সহযোগিতা থাকলে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের লক্ষ্য, ভোটের দিন প্রতিটি কেন্দ্র যেন নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয় এবং ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে নিজের ভোট দিতে পারেন।

রেদওয়ান মিলন/এএমকে