দিনাজপুর সদর উপজেলার সংকরপুর ইউনিয়নের জালালপুর শাহপাড়া গ্রামের রেজাউল ইসলামের তিন সন্তান। বড় ছেলে আতিকুর রহমান জুয়েলের বর্তমান বয়স (৩৬) বছর। জুয়েলের বয়স যখন দুই বছর তখন একদিন বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাজার থেকে রেজাউল খবর পান ছেলের হাত ভেঙে গেছে। তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে দেখেন কোনো কারণ ছাড়াই হাত ভেঙে গেছে ছেলের। সেই থেকে শুরু, তারপর অকারণেই সময়ে-অসময়ে ভাঙতে থাকে ছেলের হাত ও পা। 

জুয়েলের দুই বছর বয়সের সময় জন্ম হয় তার একমাত্র বোন রোজিনা আক্তারের। ঠিক একই বয়সে গিয়ে একই সমস্যা দেখা দেয় রোজিনারও। সামর্থ্য অনুযায়ী চলে চিকিৎসা। শিশু বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে অর্থোপেডিক চিকিৎসকসহ বাদ যায়নি দোয়া-তাবিজ, ঝাড়-ফুঁকও। কিন্তু কোনো উন্নতি নেই। ১০ বছর বয়সে রোজিনাকে চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক মাস ভর্তি থাকার পরও ধরা পড়েনি কোনো রোগ। শরীরে কোনো সমস্যা নেই বলে জানান চিকিৎসকরা।

তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন বয়স ২০ বছর পার হলে সুস্থ হয়ে হাঁটা-চলা করতে পারবেন তারা। বর্তমানে বড় ছেলে জুয়েল (৩৬) লাঠির সাহায্যে চলতে পারলেও রোজিনা আক্তারের (৩২) শরীর কোমর থেকে নিচে নিশ্চল। একই অবস্থা ১৪ বছর বয়সী ছোট ছেলে রাহাত বাবুর। উঠে বসার শক্তিও নেই তার। এমনকি পায়খানা প্রস্রাবের জন্যও সহযোগিতা নিতে হয় অন্যের। শুয়ে থাকা অবস্থায় ভেঙে যায় হাত-পায়ের হাড়।

শুক্রবার (৩ ডিসেম্বর) প্রতিবন্ধী তিন সন্তানের বাবা রেজাউল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে এসব তথ্য জানান।

বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রতিবন্ধী তিন সন্তান

 জানা গেছে, স্থানীয় প্রশাসন পরিবারের এমন দুর্দশা দেখে তিন ভাই-বোনকেই প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ভাতার টাকা, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া বিঘা দুয়েক ধানী জমি আর পাঁচকুড় বাজারে একটি ছোট কাপড়ের দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী তিন সন্তানের চিকিৎসার খরচ চালান বাবা রেজাউল ইসলাম। কিন্তু মহামারি করোনায় নতুন করে বিপদে পড়ে পরিবারটি। দীর্ঘদিন রেজাউলের দোকান বন্ধ থাকায় বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা। এ অবস্থায় সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিস্তিতে একটি ইজিবাইক কেনেন বড় ছেলে জুয়েল। পরিবারের হাল ধরতে ভাঙা হাতেই শক্ত করে ধরেছেন ইজিবাইকের হাতল। এখন ইজিবাইকের আয়ই পরিবারের আয়ের প্রধান অবলম্বন। ছোট বোন প্রতিবন্ধী রোজিনা আক্তার বাড়িতে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে শিখেছেন সেলাইয়ের কাজ। টুকটাক সেলাই করে সময় পার করেন তিনি।

তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের দুশ্চিন্তায় চোখের জ্বলে দিন কাটে বাবা-মায়ের। কাঁদতে কাঁদতে চোখে কম দেখেন বাবা রেজাউল ইসলাম। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মা আহেদা বেগমও।

রেজাউল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সুস্থ অবস্থায় জন্ম নিয়ে বাচ্চাগুলা চোখের সামনে পঙ্গু হয়া গেল। অনেক চেষ্টা করিছি। যে যাই কহিছে সেইঠেই গিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি। ওষুধ-পাতি, দোয়া-তাবিজ, ঝাড়-ফুঁক কোনোটাই বাদ দেই নাই। আমার ভাগ্য যে কি আছে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানে।

মা আহেদা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এখন আমরা বাঁচি আছি, কষ্ট হইলেও তাদের দেখি। হামরা না থাকিলে যে কী হবে। সরকার যদি হামার একটা কোনো ব্যবস্থা করি দিলে হয় তা হইলে ভালো হইল হয়।’

বড় ছেলে আতিকুর রহমান জুয়েল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘একটু হাঁটাচলা করতে পারার পর বাবার সঙ্গে দোকানে গিয়ে বসতাম। কিন্তু করোনায় দোকান বন্ধ হয়ে ব্যবসায় লস খাই। তারপর বাঁচার তাগিদে এনজিও থেকে লোন নিয়ে একটি ইজিবাইক কিনি। এখন ওটাই চালাই। যা আয় হয় তাই দিয়ে কোনো মতে সংসার চলছে।

তিনি জানান, বাবা-মায়ের পরামর্শে বছর পাঁচেক আগে বিয়ে করেছেন। চার বছর বয়সী একটি মেয়েও আছে তার। নিজে প্রতিবন্ধী হয়েও সাত সদস্যের পরিবারটির ভরসা এখন তিনিই। চান একটু সরকারি সহযোগিতা। পরে ভিক্ষার জন্য যেন হাত পাততে না হয়। 

প্রতিবেশী ফারুক হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, তারা দুই ভাই এক বোন, তিনজনই প্রতিবন্ধী। বড় ভাই অটো চালায়, তা দিয়ে তাদের সংসার কোনো মতো চলে। সরকারের পক্ষ হতে তাদের সহযোগিতা করলে প্রতিবন্ধী তিন ভাই-বোনের সংসার ভালোভাবে চলত।

শংকরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইসহাক আলী মুঠো ফোনে ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রতিবন্ধী তিন ভাই-বোনকে ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। আমি ব্যক্তিগত ভাবেও তাদের সহযোগিতা করি। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বিশেষ বরাদ্দ দিলে প্রতিবন্ধী পরিবারটির উপকার হবে। 

আরএআর