একসময় আমাদের পরিচয় ছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দেশ হিসেবে। কিন্তু আজ বাংলাদেশ সেই ঝুড়ি ছাপিয়ে সারা বিশ্বের প্লেটে খাবার তুলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বাংলার উর্বর মাটি আর কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি এখন কেবল দেশের ১৭ কোটি মানুষের ক্ষুধা মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ নিয়ে আমাদের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য পৌঁছে যাচ্ছে দুবাই থেকে লন্ডন, রিয়াদ থেকে নিউইয়র্ক।

তৈরি পোশাক খাতের পর অর্থনীতির দ্বিতীয় শক্তিশালী স্তম্ভ হওয়ার সব যোগ্যতা এখন আমাদের কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের হাতে। তবে, এই সম্ভাবনার সিংহভাগই এখনও রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে, যা সঠিক নীতি আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের আগামীর মানচিত্র।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের স্থানীয় বাজারের আকার প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ রপ্তানিতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও রপ্তানি বাজার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধান, চাল, সবজি, ফল ও মাছ সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি ব্যাপক গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ এখনও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সার্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জিডিপি ও রপ্তানিতে অবস্থান

দেশের শীর্ষ পাঁচটি রপ্তানি খাতের মধ্যে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১২ শতাংশ এবং দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত থেকে প্রাপ্ত রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের স্থানীয় বাজারের আকার প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ রপ্তানিতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও রপ্তানি বাজার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।

রপ্তানি চিত্র ও বাজারের পরিধি

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে ৬৩ ধরনের মৌলিক কৃষিপণ্যের পাশাপাশি প্রায় ৭০০ ধরনের প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করছে। দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত প্রায় ১ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫০টি রপ্তানিতে যুক্ত। তবে, মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রিত হয় মাত্র ছয় থেকে সাতটি বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫ লাখ মানুষের।

২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাত প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি ডলার রপ্তানির মাইলফলক অতিক্রম করে (আয় ছিল ১২৮ কোটি ডলার)। পরবর্তী অর্থবছরগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১১৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৩ কোটি ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার।

তথ্যমতে, খাতটি অগ্রগতির পথে থাকলেও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বর্তমানে রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশই মাত্র পাঁচটি দেশ— দুবাই, সৌদি আরব, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সীমাবদ্ধ। এছাড়া, পণ্যের বৈচিত্র্যও কম। বিস্কুট, নুডলস, ফ্রুট ড্রিংকস, পরোটা, চানাচুর ও মশলা— এই পাঁচ ধরনের পণ্যই রপ্তানি বাজারের অর্ধেক দখল করে আছে।

বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের পর্যবেক্ষণ

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত প্রাথমিক কৃষি ও ফিনিশড পণ্যের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এটি জিডিপি, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। তবে, মূল্য সংযোজনসহ কিছু ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। রপ্তানি পণ্যের নতুন গন্তব্য তৈরি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে আমাদের আরও কাজ করতে হবে। আমাদের প্রধান ক্রেতা এখনও প্রবাসী বাংলাদেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুত করতে না পারলে এ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।’

এই খাতে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “খাদ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করতে দেশের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ৪২ ধরনের অনুমতি নিতে হয়। লাইসেন্স ও নবায়ন ফি’র কারণে খরচ বেড়ে যায়। এছাড়া, শিপিং খরচ ও ওয়্যারহাউজ সুবিধার অভাব আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। তবে, আমাদের পণ্যগুলোর আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে।”

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— নিরাপদ ও মানসম্মত কাঁচামাল। ফসল উৎপাদনে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার, গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস না থাকা এবং ভারী ধাতুর সংমিশ্রণ প্রক্রিয়াজাতকরণে বাধা সৃষ্টি করছে। এছাড়া, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, সরবরাহ চেইনে দুর্বলতা এবং খাদ্যমান পরীক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবের ঘাটতি রপ্তানি বৃদ্ধির পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

এই খাতে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও কম নয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তিতে সমস্যা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে কর অবকাশ সুবিধা না পাওয়া, যন্ত্রাংশ ও উপকরণ আমদানিতে বাড়তি শুল্ক, জাহাজ ভাড়া এবং কৃষক ঋণের সুদ অনেক বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশীয় পণ্য।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতের রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রথমেই দরকার পণ্য বহুমুখীকরণ এবং মূল্য সংযোজন। উদাহরণস্বরূপ— সবজি কেবল রপ্তানি নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ, জুস বা প্রসেসড আকারে রপ্তানি করা যেতে পারে। ফলকে জ্যাম, জেলি, ক্যানিং বা ফ্রোজেন আকারে পাঠানো সম্ভব। শস্য থেকে পাউডার, প্যাকড নুডলস বা রেডি ফুড তৈরি করে রপ্তানি করা যেতে পারে। মাছ, ডেইরি, মিষ্টি ও পোলট্রিতেও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব।

পাশাপাশি নতুন নতুন রপ্তানি গন্তব্য তৈরি করা জরুরি। আফ্রিকা, আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশগুলো কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও আর্থিক সহায়তা

রপ্তানি বাড়াতে বন্দর ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর উন্নয়নও জরুরি। পণ্য খালাস প্রক্রিয়া দ্রুততর সময়ে সম্পন্ন করা; রপ্তানিমুখী শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা; কৃষক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা এবং পরিবহন খরচে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের ভূমিকা ও এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রভাব

বর্তমানে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে সরকার ১৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। ২০২৬ সালে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর এই প্রণোদনা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নগদ প্রণোদনার বিকল্প সহায়তা জরুরি। এছাড়া, কৃষক ও উৎপাদকদের গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মান উন্নয়নে উৎসাহিত করতে হবে।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, এখনও বাংলাদেশি পণ্য প্রবাসীদের জন্যই তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আমাদের পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে না পারলে এবং উন্নত দেশগুলোতে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি করতে না পারলে এই খাতের উন্নতি সীমিতই থাকবে।

বর্তমানে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে সরকার ১৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। ২০২৬ সালে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর এই প্রণোদনা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নগদ প্রণোদনার বিকল্প সহায়তা জরুরি। এছাড়া, কৃষক ও উৎপাদকদের গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মান উন্নয়নে উৎসাহিত করতে হবে

কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় কাঁচামাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই বাজারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। দেশজুড়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, মানসম্পন্ন পণ্যের উৎপাদন, পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন রপ্তানি গন্তব্য এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে দেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী নীতি এবং সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি পোশাক খাতের পর দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত পাবে। এটি করতে পারলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যাবে।

তারা বলছেন, বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প ইতোমধ্যে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তবে, রপ্তানি বাড়াতে মানসম্মত পণ্যেরে উৎপাদন, পণ্যের বহুমুখীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। এই খাতকে সচল ও সমৃদ্ধ করতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর প্রণোদনা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি খাতের স্থায়ী উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এসআই/এসএম