ঝুঁকিপূর্ণ আমানত ফেরাতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ আইসিবির
ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি প্রতিষ্ঠানে রাখা স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) ৯২০ কোটি টাকা ফেরাতে এবার আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পদ্মা ব্যাংক এবং ১০টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) রয়েছে। এদের কাছে আইনি নোটিশ পাঠাবে আইসিবি।
জানা গেছে, তাদের এফডিআরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের কাছে, যার পরিমাণ ১৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া, ফার্স্ট ফাইন্যান্সে ১৬১ কোটি ৯ লাখ, পদ্মা ব্যাংকে ১৫৪ কোটি ২ লাখ, ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ১৩৪ কোটি ৭৫ লাখ, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ৭৮ কোটি ২৩ লাখ, আভিভা ফাইন্যান্সে ৫০ কোটি ১২ লাখ এবং এফএএস ফাইন্যান্সে ৫৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর বাইরে প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সে ৪৭ কোটি ২৯ লাখ, পিপল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-এ ২৫ কোটি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ১৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে আইসিবির।
আইসিবি সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ বোর্ড সভায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সে অনুযায়ী আইনি নোটিশ পাঠানোরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে এফডিআর করা হয়েছে, সেগুলোতে আমানত রাখা সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এখন আমরা শেষ চেষ্টা করছি। তবে, আমানত ফেরানো কতটা সম্ভব হবে, সেটি নিয়ে আমি তেমন আশাবাদী নই।
তিনি বলেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ আমানতের জন্য আমাদের বড় অঙ্কের সঞ্চিতি গঠনও করতে হয়েছে; এতে আইসিবির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ঋণাত্মক হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনে সঞ্চিতি গঠন না করে আদায় দেখিয়েও লাভ নেই। কেননা, এর মধ্যে আদায়ের সম্ভবনা খুবই কম।
এর আগে আমানতের অর্থ ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চেয়েছিল আইসিবি। গত বছর, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি একটি বিশেষ দল গঠন করে এবং দীর্ঘমেয়াদি এফডিআর পর্যবেক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের জন্য অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করে।
আমানত ফেরত দেওয়ার বিষয়ে পদ্মা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. তালহা বলেন, আইসিবির কাছ থেকে নেওয়া ১৫৪ কোটি ২ লাখ টাকার এফডিআর পরিশোধ করা তাদের পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। প্রতি মাসে, তারা আইসিবি থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য চিঠি পাচ্ছে, কিন্তু তারল্য সংকটের কারণে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
একটি এনবিএফআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা এই মুহূর্তে আমানতের অর্থ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে অসহায়। যথাযথ কাগজপত্র বা জামানত ছাড়াই বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে তাদের প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, বস্তুতপক্ষে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছুই নেই। এখন তারা ওই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থ আদায় করতে পারছে না, এতে আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না।
পুঁজিবাজারে সহায়তার দায়িত্বপ্রাপ্ত আইসিবি পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে উচ্চ সুদের আশায় এসব ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের এফডিআর বিনিয়োগ করেছিল। তবে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র তারল্য সংকটে পড়ায় এফডিআরের টাকা ফেরত পাওয়া যায়নি। এতে আইসিবি নিজেই মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়ে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে আইসিবি মোট ৭৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করে, যার মধ্যে ৫৮৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা রাখা হয় অনাদায়ী এফডিআরসহ অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে। এর ফলে আলোচিত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান হয় ১ হাজার ২১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে সঞ্চিতি সংরক্ষণ না করায় আইসিবির মুনাফা হয়েছিল ৩২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
এমএমএইচ/এনএফ