৩ বছরে অপ্রয়োজনীয় কল দুই কোটি ৫৯ লাখ। এতে অপচয় হচ্ছে পুলিশের মূল্যবান সময়

‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’ চালু হওয়ার পর সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই কোটি ৬১ লাখ ৪৪ হাজার ৪১টি কল এসেছে। এর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় কল দুই কোটি ৫৯ লাখ। এসব কল ধরতে অপচয় হয়েছে মূল্যবান সময়...

২০২০ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় ফোন আসে বাংলাদেশ পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘জাতীয় জরুরি সেবা- ৯৯৯’। এ-পাশ থেকে ফোন ধরেন পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই)। ও-পাশ থেকে কথা বলেন রামপুরার এক মা। পুলিশের এসআই বললেন, ‘জ্বী বলুন, আপনাকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি।’ পুলিশকে ওই মা বলেন, ‘আমার বাবু ভাত খেতে চাইছে না, পুলিশের সঙ্গে কথা বলায়ে দেন। ওকে ভয় দেখান।’

২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’ এর কার্যক্রম শুরু হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত এ ধরনের প্রায় ৮৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯৪টি অপ্রয়োজনীয় কল এসেছে।

৯৯৯ ইউনিট থেকে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই কোটি ৬১ লাখ ৪৪ হাজার ৪১টি কল এসেছে। যার মধ্যে ৭৯% ভাগ কলই পুলিশের জন্য ছিল বিরক্তিকর।

প্রতিনিয়ত আমরা এমন অপ্রীতিকর প্র্যাংক কল পাচ্ছি। কেউ ফোন দিয়ে বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য পুলিশকে কল দিচ্ছেন, কেউ ফোন করে কল সেন্টারের মেয়ে অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন

আনোয়ার সাত্তার, পরিদর্শক, জাতীয় জরুরি সেবা

৯৯৯ জানায়, জরুরি সেবা চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট দুই কোটি ৫৯ লাখ অপ্রয়োজনীয় কল এসেছে। এসব কল ধরতে অপচয় হয়েছে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের মূল্যবান সময়।

প্র্যাংক কল (মজার উদ্দেশ্যে ফোন কল)

‘গতকাল যে আপুটার (কল সেন্টারের এসআই) সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তাকে ফোনটা দেন। তার সঙ্গে কথা বলব।’ ৯৯৯- এ নিয়মিত আসছে এ ধরনের প্র্যাংক কল। গত তিন বছরে এমন কলের সংখ্যা ১৯ লাখ ৫৫ হাজার।

জাতীয় জরুরি সেবার পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) আনোয়ার সাত্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত আমরা এমন অপ্রীতিকর প্র্যাংক কল পাচ্ছি। কেউ ফোন দিয়ে বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য পুলিশকে কল দিচ্ছেন, কেউ ফোন করে কল সেন্টারের মেয়ে অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন। কেউ  বলে আগুন লেগেছে। অথচ আমরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর দেখি, সেখানে আগুন লাগেনি। যিনি ফোন দিয়েছিলেন তার ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এমন কল আমরা প্রতিনিয়ত পেয়ে থাকি। আমাদের ফোন রিসিভের ক্যাপাসিটি যদি শতভাগ থাকে তাহলে ৮০ ভাগই এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় কল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়।’

সরকারের জরুরি সেবার নম্বরটি টোল ফ্রি। এ সুযোগে মোবাইলের ব্যালান্স শেষ হলেই অনেকে ৯৯৯- এ কল দিয়ে বলেন, মোবাইলে রিচার্জ করে দেন

আনোয়ার সাত্তার, পরিদর্শক, জাতীয় জরুরি সেবা

তিনি আরও বলেন, যারা বারবার এ ধরনের প্র্যাংক কল করে অপারেটরদের সময় নষ্ট করছেন তাদেরকে ২/৩ মাসের জন্য ব্লক করে দেয়া হয়। এছাড়া সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় একটি নীতিমালা করা হয়েছে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী, তথ্য দেওয়ার নামে কেউ প্রতারণা করলে বা মিথ্যা তথ্য দিলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।

মোবাইলে ব্যালান্স শেষ, রিচার্জ করে দিন

সরকার জরুরি সেবার নম্বরটি টোল ফ্রি বা বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা রেখেছে। এ সুযোগে মোবাইলের ব্যালান্স শেষ হলেই ৯৯৯- এ কল দেন অনেকে। ৯৯৯ ইউনিট জানায়, প্রতিদিনই এ ধরনের কল আসে। ফোন দিয়েই ৯৯৯- এর অপারেটরদের কাছে মোবাইলে টাকা রিচার্জ করে দিতে বলা হয়। কিন্তু প্রতিনিধিরা রিচার্জ করে দিতে না পারায় অনেক সময় তাদের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখান কলাররা।

৯৯৯- এর রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, গেল বছরের (২০২০ সাল) অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে একজন ফোন দিয়ে বলেন, তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে সমস্যা। দ্রুত মিটিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে। একজন মেয়ে ফোন দিয়ে বলেন, তার বাবা তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। কেউ বলেন, আসামি গ্রেফতার করতে।

অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এটি অনেক ইতিবাচক দিক। এ সেবার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ তাদের বিপদের মুহূর্তে পুলিশসহ ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাচ্ছেন। অগণিত মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি আমরা। ৯৯৯- এর সেবার মান আরও বৃদ্ধির জন্য আমরা নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছি

মো. সোহেল রানা, এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর), পুলিশ সদরদপ্তর

এ ধরনের কল নিয়ে ইন্সপেক্টর আনোয়ার সাত্তার বলেন, ৯৯৯- এর কনসেপ্টটা হচ্ছে জরুরি সার্ভিসের জন্য। জরুরি ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর জন্য। অথচ এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৬ লাখ নাগরিক তাদের নানাবিধ ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে ফোন দিয়েছেন, যেটা জরুরি নয়। তবুও আমরা এসব ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে উপদেশ দেই।

ব্ল্যাংক কল

একের পর এক ফোন আসে। রিসিভ করলে ও-পাশ থেকে কোনো শব্দ শোনা যায় না। তবে ফোনও কাটে না। জরুরি সেবায় এ ধরনের কলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রায় এক কোটি ১৮ লাখ। বিভিন্ন কারণে এ ধরনের ব্ল্যাংক কলগুলো আসে। কলগুলোর সংখ্যা কমানোর চেষ্টা চলছে।

ফ্রি হওয়ায় কেউ আবার কল করে টাকা রিচার্জ করে দিতে বলছেন

শিশুদের কল, স্কুল খুলবে কবে?

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ ১২ হাজার শিশু জরুরি সেবায় কল দিয়েছেন। তবে করোনাকালীন এবং এর পরের দিনগুলোতে এ সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। ৯৯৯ থেকে জানা গেছে, শিশুদের অধিকাংশ কল ছিল ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরই জিজ্ঞাসা ছিল, ‘স্কুল-কলেজ কবে খুলবে’, ‘পরীক্ষা কবে হবে’, ‘কোচিং কি সত্যি সত্যিই বন্ধ’। প্রথমদিকে ৯৯৯ থেকে সেসব শিশুদের ‘সরকারি তথ্যসেবা ৩৩৩’- তে যোগাযোগ করতে বলা হতো। পরবর্তীতে শিশুদের আগ্রহের কারণে ৯৯৯ নিজেই শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি জেনে শিশুদের জানিয়ে দেয়।

সাজেক ও দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে উদ্ধার অভিযান, প্রশংসিত ‘৯৯৯’

গেল বছর নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের ঘটনা। রোকসানা আক্তার (৩৮) স্বামী আব্দুল ওহাবকে নিয়ে ঢাকা থেকে সাজেক ভ্যালি ভ্রমণে যান। সেখানে ঝর্ণা দেখার জন্য পাহাড় থেকে দুই হাজার ফুট নিচে নামার সময় হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পা ভেঙে ফেলেন। নির্জন পাহাড়ে দিশেহারা হয়ে ৯৯৯ এ ফোন দেন তারা। সংবাদ পেয়ে মুহূর্তেই সাজেকে অবস্থিত লুই লুই পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই মুশফিকুর রহমান সঙ্গীয় ফোর্সসহ স্থানীয়দের নিয়ে তাদের উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

নভেম্বরের শুরুর দিকে ৯৯৯- এ কল আসে এক ভুক্তভোগীর। কলটি ছিল দৌলতদিয়া যৌনপল্লী থেকে। ফোনে আপ্লুত কণ্ঠে এক তরুণী কলার জানান, তার বাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারী গুচ্ছগ্রাম। এক মাস ঊনত্রিশ দিন আগে এক দালাল চাকরির প্রলোভন দিয়ে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে নিয়ে আসে। সেখানে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজ করানো হচ্ছিল, রাজি না হলে মারধর করা হতো।

কেউ কল সেন্টারের মেয়ে অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন

তরুণী ফোনে আরও জানান, তার কাছে কোনো ফোন নেই। এক সুহৃদ ব্যক্তির ফোন থেকে তিনি ৯৯৯- এ কল করেছেন। ৯৯৯ তাৎক্ষণিক কলারের সঙ্গে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ডিউটি অফিসারের কথা বলিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই তরুণীকে উদ্ধার করে প্রথমে থানায় নিয়ে আসেন। পরে আদালতের অনুমতির মাধ্যমে মেয়েটিকে সেফ হোমে পাঠানো হয়।

৯৯৯- এর এসব সেবামূলক কাজ নিয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি- মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো.  সোহেল রানা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জাতীয় জরুরি নম্বর ৯৯৯- এর মাধ্যমে আমরা উন্নত বিশ্বের সেবা বাংলাদেশে চালু করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এটি অনেক ইতিবাচক দিক। এ সেবার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ তাদের বিপদের মুহূর্তে পুলিশসহ ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাচ্ছেন। শ্রেণি-পেশা ও সামাজিক অবস্থান, নির্বিশেষে নারী, শিশু, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীসহ সবাই পাচ্ছেন এ সেবা।’

তিনি আরও বলেন, বাল্যবিয়ে, শিশু ও নারী নির্যাতন, দুর্ঘটনা ও দুর্যোগসহ বিপদগ্রস্ত মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে সম্ভাব্য ও স্বল্পতম সময়ে আমরা পৌঁছে যাচ্ছি সেবাপ্রার্থীর কাছে। অগণিত মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি আমরা। ভিক্টিম উদ্ধারের পাশাপাশি প্রতিদিন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে শত শত অপরাধীর বিরুদ্ধে। ৯৯৯- এর সেবার মান বৃদ্ধির জন্য আমরা নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছি।

এআর/এমএআর