বছরের শুরুতে পুঁজিবাজারে ছিল উত্থানের হাওয়া। কিন্তু প্রথম মাস শেষ হওয়ার আগেই হাওয়া বদল। শুরু হয় দরপতন। এরপর থেমে থেমে তা চলতে থাকে বছরজুড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কারসাজিচক্র। 

দরপতনের ধারা আর চক্রের কারসাজিতে সারা বছরই বিনিয়োগকারীদের কাটাতে হয়েছে পুঁজি হারানোর ভয়, আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। প্রায় ২ লাখ বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টধারী শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছেড়ে দেন। এছাড়াও আরও সাড়ে ৩ লাখ বিওধারী শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। অর্থাৎ তাদের বিও হিসাব রয়েছে, কিন্তু সেখানে কোনো শেয়ার নেই।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দরপতন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা উদ্যোগে বাজার একটু স্বাভাবিক হলে গণমাধ্যমে আসে শ্রীলঙ্কার দেউলিয়া অবস্থায় পড়ার খবর।

বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিক সঙ্কটের আশঙ্কায় অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয় ডলার সংকট। সূচক ৭ হাজার পয়েন্ট থেকে কমে ৬ হাজার পয়েন্টের নিচে চলে আসে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের রক্ষায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে।

তারপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কমে যাওয়ার ঘটনা এবং সামনে দুর্ভিক্ষ আসছে এমন খবরে বিনিয়োগকারীদের উৎকণ্ঠা আরও বাড়ে। তারা ব্যাংকের আমানতের টাকাও উত্তোলন করতে শুরু করে। যার প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে।

এসব বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসইর) পরিচালক শাকিল রিজভী ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত এক বছরে বিএসইসি পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে। পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সীমা বাজার মূল্যের পরিবর্তে শেয়ার কেনার মূল্যের বিধান করেছে। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের জন্য আলাদা একটি ফান্ড গঠন করেছে। পুঁজিবাজারকে সার্পোট দেওয়ার জন্য পুঁজিবাজার স্থিতিশীল তহবিল ফান্ড গঠন করেছে। এগুলো সব ভালো উদ্যোগ। 

আরও পড়ুন : ‌‘হুদার’ সংকটে চ্যালেঞ্জে ‘আউয়াল’, আস্থা নিয়ে সংশয়

কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চলমান ডলার সংকট ও টাকার মান কমায় বিনিয়োগকারীরা ভয়ে শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিচ্ছে। এখনও নেতিবাচক প্রবণতায় রয়েছে পুঁজিবাজার। নানা উদ্যোগ থাকলেও বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করা যাচ্ছে না।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়ার কারসাজি প্রমাণিত হওয়ার পর কিছু ব্যক্তিকে নামমাত্র জরিমানা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত তিন চার মাস ধরে ওরিয়ন ফার্মা, ওরিয়ন ইনফিউশনসহ হাতে গোনা ৫-৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কারসাজিতে মেতে ওঠে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিষয়ে কোনো তদন্ত করেনি। তাদের বিচারের আওতায় আনেনি। এ ছাড়া তিন শতাধিক কোম্পানির শেয়ার ফ্লোর প্রাইসের কারণে আটকে রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ওইসব কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচা করতে পারছেন না।  

পুঁজিবাজার ছেড়েছেন পৌনে ২ লাখ বিনিয়োগকারী
এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে প্রায় ২ লাখ বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশের (সিডিবিএল) তথ্য মতে, ১ জানুয়ারি বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব ছিল ২০ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৯টি। সেখান থেকে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫৩টি কমে সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর হিসাব সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫৪৬টি।  

এছাড়া আরও ৩ লাখ ৪৯ হাজার বিওধারী শেয়ার বিক্রি করে দেন। অর্থাৎ তাদের হাতে কোনো শেয়ার নেই। সিডিবিএল বলছে, বর্তমানে পুঁজিবাজারে ১৮ লাখ ৫৯ হাজার বিও রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ লাখ ১৪ হাজার বিওতে শেয়ার রয়েছে।  

অধিকাংশ সূচকের পতন হওয়ার বিদায়ী বছরের বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কমেছে। তবে বছরের শেষ সময়ে পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকার ট্রেজারি বন্ড যোগ হওয়ার বাজার মূলধন বৃদ্ধি পেয়েছে।

ডিএসইর তথ্য মতে, বছরের শুরুতে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৬৩৫ কোটি ৩৯ লাখ ৬১ হাজার টাকা। ১৫ ডিসেম্বর বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ কোটি ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা। অর্থাৎ মূলধন বেড়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৯২ কোটি ৫২ লাখ ৬১ হাজার টাকা।

সরকারি বন্ডের লেনদেন 
এ বছরে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ঘটনার একটি হচ্ছে সরকারি বন্ডে লেনদেন চালুর ঘটনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চলতি বছরের ১০ অক্টোবর সরকারি বন্ডের লেনদেন শুরু হয়। কিন্তু প্রত্যাশা অনুসারে বন্ড লেনদেন হচ্ছে না। সরকারি বন্ডগুলোর লেনদেনের ফলে পুঁজিবাজারে আকার বা বাজার মূলধন বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। ফলে দেশের জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান ১৪-১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

ফ্লোর প্রাইস আরোপ 
অব্যাহত দরপতন রোধে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষায় গত ২৮ জুলাই পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তাতে প্রথম কিছু দিন দরপতন রোধ হয়। বাজারও ভালো হয়, কিন্তু কারসাজি চক্র এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১৫ থেকে ২০ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে শুরু করে জুয়া। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ে। 

পুঁজিবাজারে চলতি বছরের আরকেটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেডকে অনুমোদন দেওয়া।  

এবিজি লিমিটেড সিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার কিনে এই এক্সচেঞ্জের মালিকানায় কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে অন্তুর্ভুক্ত হয়েছে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা সিএসই বসুন্ধরার সঙ্গে মিলে দেশের বাজারে কমোডেটি এক্সচেঞ্জ চালু করবে।  

আকার বেড়েছে এসএমই মার্কেটের 
২০২১ সালে ছয়টি কোম্পানি নিয়ে যাত্রা শুরু করা ডিএসইর এমএমই মার্কেটের আকার বেড়েছে। বর্তমানে এই মার্কেটে ১৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই মার্কেটের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দিচ্ছে। ফলে একদিকে উদ্যোক্তারা লাভবান হচ্ছে অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও ভালো মুনাফা পাচ্ছে।

আইপিওর অনুমোদন
বিদায়ী বছরে ৮টি কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের জন্য অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কোম্পানিগুলো অর্থ নিয়ে ব্যবসায় সম্প্রসারণের কাজে ব্যয়ও করেছে। 

আরও পড়ুন : নির্বাচন আর সম্মেলনেই বছর পার

কোম্পানিগুলোর মধ্যে আইপিওর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নিয়েছে- জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড ও নাভানা ফার্মাসিটিউক্যালস লিমিটেড। ফিক্সডপ্রাইস পদ্ধতিতে অর্থ নিয়েছে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, ইউনিয়ন ব্যাংক, বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স লিমিটিড।

বিএসইসি বলছে, এ বছর আইপিওর চেয়ে বন্ড ছেড়ে অর্থ উত্তোলনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সংখ্যার দিক দিয়ে কয়েকগুণ বেশি কোম্পানিকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সুযোগ সবচেয়ে বেশি কাজে লাগিয়েছে ব্যাংকগুলো।

‘যখন যা প্রয়োজন ছিল তাই করেছি’
গোটা বছরের পুঁজিবাজারের অবস্থা ও নানা উদ্যোগ সম্পর্কে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করে পুঁজিবাজারের জন্য যখন যা প্রয়োজন ছিল তাই করেছি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার আরও ভালো অবস্থায় যাবে। কিন্তু মহামারির পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ কারণে প্রত্যাশা অনুসারে পুঁজিবাজার যেখানে যাওয়ার কথাছিল সেখানে যায়নি।  

বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। ফাইল ছবি

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থা সংকট রয়েছে। এটা আরও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে কারসাজি চক্রের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। তাদের ফায়দা হাসিলের সুযোগ দেওয়া যাবে না। যখন মানুষ দেখবে বিনিয়োগের অর্থ নিরাপদ থাকে। এখান থেকে মুনাফা আসে, তখন মানুষ বাজারে আসবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল রয়েছে। পুঁজিবাজারে ভালো করতে হলে, ভালো ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়াতে হবে। তবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাজারে আসবেন।

জরিমানা ও মামলা
প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অর্থ লোপাট, বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব থেকে অর্থ তছরুপ এবং শেয়ার কারসাজির দায়ে কয়েকটি কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালক, ব্রোকার হাউজের এমডি-পরিচালক এবং বিনিয়োগকারীদের শাস্তি হিসেবে অর্থদণ্ড (জরিমানা) এবং ফৌজদারি মামলা করেছে বিএসইসি। 

বিএসইসির তথ্য মতে, বছরের শুরুতে আইপিওর অর্থ লোপাটের অপরাধে আমান ফাইবার কটনের এমডি রফিকুল ইসলামকে ৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া তরিকুল ইসলাম ও তৌফিকুল ইসলামকেও ৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তারাও প্রতিষ্ঠানের এমডি হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই ঘটনায় কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলাও হয়। পাশাপাশি অডিটর প্রতিষ্ঠান আতা খান অ্যান্ড চাটার্ড অ্যাকাউন্টস কোম্পানিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।   

আরও পড়ুন : ইউএনওর গলাবাজি থেকে ‘জনস্বার্থে’ অবসর, আমলাতন্ত্রে ঘটনাবহুল ২০২২

বিনিয়োগকারীদের বিও অ্যাকাউন্টের টাকা তছরুপ করার দায়ে ডিএসইর সদস্য বানকো সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এছাড়াও, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, ডেল্টা লাইফ, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স, ওয়ান ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, বিডিকম অনলাইন, ফরচুন সুজসহ এক ডজন কোম্পানির শেয়ার কারসাজির ঘটনায় বহুল আলোচিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরো, তার পরিবারের সদস্য এবং তার সহযোগীদের কোটি কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এমআই/এনএফ