বিক্রয়ের তথ্য গোপন ও উৎসে ভ্যাট কম পরিশোধের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সুদসহ মোট ৯৭ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ফাঁকি নিয়ে বিপাকে পড়েছে ব্যুরো ভেরিতাস গ্রুপ নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে ফাঁকি দেওয়া বা অনাদায়ি ভ্যাট আদায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে দুই দফায় দাবিনামা ইস্যু করেছে এনবিআরের ভ্যাট অফিস।

ব্যুরো ভেরিতাস গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ও সুদ বাবদ ওই টাকা পাবে সরকার। ঢাকা (পশ্চিম) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের নিজস্ব তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি উদঘাটিত হয়েছে।  

আরও পড়ুন >> রপ্তানির আড়ালে ৫ দেশে ২১ কোটি টাকা পাচার

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সিএ ফার্ম (অডিটর প্রতিষ্ঠান) ও দাখিলপত্রের ভিত্তিতে বিক্রয় তথ্য গোপন করে ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেড ২০ কোটি ৩৪ লাখ ২৮ হাজার ১৫৮ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও দাখিল করা নথিপত্রের ভিত্তিতে পরিহার করা উৎসে ভ্যাটের পরিমাণ ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯৬ হাজার ৮৩৫ টাকা। সবমিলিয়ে সুদ ছাড়া মোট আদায়যোগ্য ভ্যাটের পরিমাণ ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৩ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি বকেয়া ভ্যাট ও উৎসে মূসকবাবদ ওই টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। যা সরকারি কোষাগারে পরিশোধযোগ্য এবং ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটের তদন্তে কর ফাঁকির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এর সঙ্গে ২০২৩-এর জুন পর্যন্ত দুই শতাংশ (মাসিক) হারে প্রযোজ্য সুদবাবদ ৬৩ কোটি ৬৪ লাখ ৬৬ হাজার ১৫৮ টাকা যোগ করলে আদায়যোগ্য মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৬ কোটি ৮৮ লাখ ৯১ হাজার ১৫১ টাকা।

তদন্ত প্রতিবেদন ও এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেড ২০১৩ সালের বিক্রয় তথ্য গোপনের মাধ্যমে চার কোটি ৮৬ লাখ ৪২ হাজার ১০৪ টাকা, উৎসে ভ্যাট তিন কোটি ৫০ লাখ চার হাজার ৭৯৯ টাকাসহ মোট সাত কোটি ৯১ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৩ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

আরও পড়ুন >> ভ্যাটের হাজার কোটি টাকা লোপাট : ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের রুল

পরের বছর ২০১৪ সালে বিক্রয় তথ্য গোপনের মাধ্যমে পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ ৩২ হাজার ৭২৩ টাকার ভ্যাট এবং উৎসে ভ্যাট দুই কোটি ৪৭ লাখ ৫৫ হাজার ১২২ টাকাসহ মোট আট কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

২০১৫ সালে বিক্রয় তথ্য গোপন করে ছয় কোটি ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৫ টাকার ভ্যাট এবং উৎসে ভ্যাট বাবদ চার কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার ৫৬৯ টাকাসহ মোট ১১ কোটি ২১ লাখ ৭৪ হাজার ২৬৪ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

২০১৬ সালে বিক্রয় তথ্য গোপন করে দুই কোটি ২০ লাখ ১৩ হাজার ৪৩৫ টাকার ভ্যাট এবং উৎসে ভ্যাট বাবদ এক কোটি চার লাখ ৯১ হাজার ৭৪৯ টাকাসহ মোট তিন কোটি ২৫ লাখ পাঁচ হাজার ১৮৪ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

২০১৭ সালে একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক কোটি ৪ লাখ ৮৮ হাজার ২০২ টাকার ভ্যাট এবং উৎসে ভ্যাট বাবদ এক কোটি ৪৭ লাখ ২২ হাজার ৫৯৬ টাকাসহ মোট দুই কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ৭৯৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস লিমিটেড।

আরও পড়ুন >> ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ৭২ হাজার, রিটার্ন দেয় না ২২ শতাংশ

পাঁচ বছরে বিক্রয়ের তথ্য গোপন ও উৎসে ভ্যাট হিসেবে মোট ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা ফাঁকি দিয়েছে। এর সঙ্গে মাসিক ২ শতাংশ হিসেবে ২০১৩ সালে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের সুদ এখন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি চার লাখ টাকা (১১৪ মাস); ২০১৪ সালের ভ্যাটের সুদ ১৭ কোটি এক লাখ টাকা (১০২ মাস), ২০১৫ সালের ভ্যাটের সুদ ২০ কোটি ১৯ লাখ টাকা (৯০ মাস), ২০১৬ সালের সুদ পাঁচ কোটি সাত লাখ টাকা (৭৮ মাস) এবং ২০১৭ সালের সুদ তিন কোটি ৩২ লাখ টাকাসহ এখন পর্যন্ত মোট ৬৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার সুদ আদায় প্রযোজ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

অর্থাৎ চূড়ান্ত হিসাবে ভ্যাট ফাঁকি ও সুদসহ মোট প্রায় ৯৭ কোটি টাকা পাওনা দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেডের কাছে।  

এ বিষয়ে ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানটির দাখিল করা জবাব সার্বিক পর্যালোচনায় ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিরীক্ষা মেয়াদে আলোচ্য প্রতিষ্ঠান প্রদেয় ও উৎসে মূসকবাবদ ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৩ টাকার রাজস্ব পরিহারের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যুরো ভেরিতাস কর্মকর্তাদের শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য ও প্রাপ্ত দলিলের ভিত্তিতে মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১ এর ধারা ৫৫ (১) অনুযায়ী জারি করা প্রাথমিক দাবিনামা যৌক্তিক দেখিয়ে আইনের ৫৫ (৩) ধারা অনুযায়ী গত জুন মাসে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ফাঁকিপ্রদত্ত রাজস্বের ওপর মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১ এর ধারা ৩৭ এর উপ-ধারা (৩) অনুযায়ী প্রযোজ্য সুদবাবদ (জুন ২০২৩ পর্যন্ত সাময়িকভাবে গণনা করা) ৬৩ কোটি ৬৪ লাখ ৬৬ হাজার ১৫৮ টাকা আদায়যোগ্য বলে দাবিনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন >> মদ বিক্রিতে পর্যটন কর্পোরেশনের ভ্যাট ফাঁকি ৭৩ লাখ

এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেডকে ভ্যাট হিসেবে মোট ৩৩ কোটি ২৪ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৩ টাকা এবং সুদ হিসেবে মোট ৬৩ কোটি ৬৪ লাখ ৬৬ হাজার ১৫৮ টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে পরিশোধের আদেশ দেওয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টি মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১ এর ধারা ৩৭ অনুযায়ী অর্থদণ্ড আরোপের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ভ্যাট অফিসের প্রাথমিক দাবিনামায় প্রতিষ্ঠানটি আপত্তি জানিয়েছিল। এরপরই অধিকতর যাচাই করে এবার চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে। চূড়ান্ত দাবিনামার পরও তাদের আপত্তি থাকলে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবে। তবে আমাদের তদন্ত অনুসারে ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে। তাই তাদের অর্থ পরিশোধ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেডের ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে জানতে ঢাকা পোস্টের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল ই-মেইলে গত ২৩ আগস্ট যোগাযোগ করা হয়। এখন পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।  

ব্যুরো ভেরিতাস গ্রুপ মূলত একটি আন্তর্জাতিক বহুজাতিক কোম্পানি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টেস্টিং, নিরীক্ষা ও সার্টিফিকেশনে নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির দুটো মেরিন সার্ভেয়ার, তিনটি নিরীক্ষক ও দুটো শিল্প সার্ভেয়ার অফিস রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশে মেশিনারিজের গুণগতমান ও পরিমাপের জন্য অডিট করা ছাড়াও সিঙ্গাপুরের সহযোগিতায় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিচালনার কাজে নিযুক্ত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে ব্যুরো ভেরিতাস দেশের এক-তৃতীয়াংশ পাওয়ার জেনারেশন, পুরো পাওয়ার ট্রান্সমিশন এবং পোশাক, সিরামিক, জাহাজ নির্মাণ, প্রকৌশলসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেশনের কাজ করে বলে জানা গেছে। 

ওই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ব্যুরো ভেরিতাস কনজ্যুমার প্রোডাক্টস সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেড। এটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ল্যাব টেস্ট করে থাকে। যা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগীয় দপ্তরের সাভারের ইয়ারপুর সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত।

আরএম/জেডএস