ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মাঙ্কিপক্স আক্রান্তের ঘটনা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। ভাইরাল সংক্রমণজনিত এই রোগটি পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকায় সাধারণত সবচেয়ে বেশি দেখা গেলেও এবার সেই গণ্ডি পেরিয়েছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ৮০ জনের মাঙ্কিপক্স সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ১১টি দেশে আরও ৫০ জনের এই ভাইরাসে আক্রান্তের ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। মাঙ্কিপক্সের বর্তমান প্রাদুর্ভাব এবং ঝুঁকি সম্পর্কে এক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মাঙ্কিপক্স কতটা বিপজ্জনক?

শুক্রবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন একজন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন, এই সময়ে সাধারণ জনগণের জন্য মাঙ্কিপক্সে আক্রান্তের ঝুঁকি কম।

মাঙ্কিপক্স একটি বিরল ও স্বল্প পরিচিত রোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার উষ্ণ ও আদ্র বনাঞ্চলের বানররা ছিল এ রোগের প্রথম শিকার। তারপর একসময় মানবদেহেও সংক্রমিত হওয়া শুরু করে রোগটি।

মাঙ্কিপক্স একটি ভাইরাসজনিত অসুখ। স্মলপক্স ভাইরাস শ্রেণির একটি ভাইরাস এ রোগের জন্য দায়ী। ভাইরাসটির দু’টি রূপান্তরিত ধরন রয়েছে— মধ্য আফ্রিকান ও পশ্চিম আফ্রিকান।

বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন জনের দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ভাইরাসের জিন বিন্যাস করছেন, জানিয়েছে  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

রোগটির বিভিন্ন লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, ঘেমে যাওয়া, পিঠে ব্যথা, মাংসপেশির টান ও অবসাদ। প্রথম পর্যায়ে রোগীর জ্বর আসে, পাশাপাশি শরীরে দেখা দেয় ফোস্কা ও অধিকাংশ ঘটনায় শুরুতে মুখে ফুসকুড়ি ওঠে। পরে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে; বিশেষ করে হাত ও পায়ের তালুতে।

মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলেছেন, এই ভাইরাল সংক্রমণের সাথে গুটিবসন্তের সম্পর্ক আছে। তবে সংক্রমণ সাধারণত মৃদু হয়। বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকান ভাইরাসের প্রজাতিটি মৃদু ধরনের; যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সনাক্ত হয়েছে। এই প্রজাতিতে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার প্রায় ১ শতাংশ। বেশিরভাগ মানুষ দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

১৯৭০ সালের পর থেকে আফ্রিকার ১১ দেশে মাঙ্কিপক্স সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের পর নাইজেরিয়ায় এবার সবচেয়ে বেশি এ রোগের প্রকোপ দেখা গেছে। দেশটিতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের দেহে উপসর্গ দেখা গেলেও ১৫ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

গত ৭ মে প্রথম একজন ইউরোপীয় নাগরিকের দেহে মাঙ্কিপক্স শনাক্ত হয়। নাইজেরিয়া থেকে ওই ব্যক্তি ইংল্যান্ডে ফিরে এসেছিলেন। এরপর থেকে আফ্রিকার বাইরে ১০০ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড একাডেমিক।

শনাক্তদের বেশিরভাগের সঙ্গে আফ্রিকা ভ্রমণের ইতিহাস নেই। যে কারণে রোগের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি অস্পষ্ট। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, সামাজিক সংস্পর্শ থেকে এটা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ মহামারি ডেকে আনা সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের মতো মাঙ্কিপক্স সহজে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। গণ সংক্রমণের ঝুঁকিও খুব কম। এতদিন কেবল মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকাতেই এ রোগে আক্রান্ত রোগীর দেখা মিলত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এখন পর্যন্ত মাঙ্কিপক্স শনাক্তের ঘটনাগুলো কিছুটা অস্বাভাবিক

বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, সক্রিয় ফুসকুড়ি আছে এমন ব্যক্তির ত্বকের সাথে অন্য কারও ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমে বর্তমানে মাঙ্কিপক্সের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছে। একবার কারও সংক্রমণ শনাক্ত হয়ে গেলে তা যাতে অন্যদের শরীরে না ছড়ায় সেজন্য এর বিস্তারের লাগাম টানতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক মার্টিন হির্সচ রয়টার্সকে বলেছেন, কোভিড-১৯ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি অত্যন্ত সংক্রামক। কিন্তু মাঙ্কিপক্সের ক্ষেত্রে এমন ঘটবে না বলে মনে হচ্ছে।

বর্তমানে মাঙ্কিপক্সের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়া লোকজনের মাঝে— এমন অনেক পুরুষ আছেন, যারা পুরুষদের সাথে যৌন সম্পর্ক করেছেন। স্পেনের মাদ্রিদ অঞ্চলের সাউনার কয়েকটি ঘটনায় এ ধরনের শারীরিক সম্পর্কের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কী উদ্বিগ্ন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চলমান প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত মাঙ্কিপক্স শনাক্তের ঘটনাগুলো কিছুটা অস্বাভাবিক। যেসব দেশে ভাইরাস নিয়মিত ছড়িয়ে পড়ে না, সেসব দেশে বর্তমানে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। বর্তমানে শনাক্ত হওয়া এই ভাইরাসের উত্স এবং এর রূপ বদল ঘটেছে কিনা তা বোঝার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

মাঙ্কিপক্সে এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং পর্তুগালেই বেশিরভাগ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতেও সংক্রমণ ঘটেছে এবং বোস্টনেও মাঙ্কিপক্সে একজনের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আরও সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোতে আসন্ন গ্রীষ্মের উৎসব, পার্টি এবং ছুটির সময়ে লোকজন সমবেত হওয়ায় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্মকর্তারা।

গুটিবসন্তের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধকে বিশেষ পরিস্থিতিতে মাঙ্কিপক্সের চিকিত্সায় ব্যবহার করা যেতে পারে, বলছে যুক্তরাষ্ট্র

সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়?

মাঙ্কিপক্স রোগের জন্য এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, স্মলপক্স বা গুটিবসন্তে জন্য ব্যবহৃত টিকা মাঙ্কিপক্স প্রতিরোধে ৮৫ শতাংশ কার্যকর। রোগীদের সেবা দেওয়ার সময় যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন, সেই স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের গুটিবসন্তের টিকা দেওয়া শুরু করেছে যুক্তরাজ্য।

মার্কিন সরকার বলেছে, পুরো দেশের মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য স্ট্র্যাটেজিক ন্যাশনাল স্টকপাইলে (এসএনএস) গুটিবসন্তের ভ্যাকসিনের যথেষ্ট মজুত আছে। এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের একজন মুখপাত্র বলেছেন, গুটিবসন্তের জন্য অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রয়েছে; যা বিশেষ পরিস্থিতিতে মাঙ্কিপক্সের চিকিত্সায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, আরও বিশদভাবে বলা যায়— এমন কারও সাথে লোকজনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক এড়িয়ে চলা উচিত, যার শরীরে ফুসকুড়ি রয়েছে অথবা অন্য কোনও অসুস্থতায় ভুগছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হয়েছেন বলে যাদের সন্দেহ রয়েছে, তাদের আইসোলেশনে যাওয়া এবং চিকিৎসা সেবা নেওয়া উচিত।

চলমান প্রাদুর্ভাবের নেপথ্যে কী?

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব সাসকাচেওয়ানের ভ্যাকসিন এবং সংক্রামক রোগ সংস্থার ভাইরোলজিস্ট অ্যাঞ্জেলা রাসমুসেন বলেছেন, ভাইরাসটি নতুন কিছু নয় এবং এটি প্রত্যাশিত।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনসহ বেশ কয়েকটি কারণ ভাইরাসের উত্থান এবং বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে কোভিড মহামারির প্রেক্ষাপটে বিশ্ব যে কোনও ধরনের নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক রয়েছে।

এসএস