মেক্সিকোর এক নারী অনলাইনে পরিচয় থেকে প্রেমে জড়িয়ে পড়ার পর প্রেমিকের সাথে দেখা করতে পাড়ি দিয়েছিলেন ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ। প্রেমিকের সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাতের আশায় মেক্সিকো ছেড়ে পেরুতে পৌঁছে মর্মান্তিকভাবে খুন হয়েছেন তিনি। তাকে হত্যার পর কেটে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করে নিয়ে ধড় ফেলে দেওয়া হয়েছে সমুদ্রে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫১ বছর বয়সী ওই নারীর টুকরো টুকরো মরদেহ গত ১০ নভেম্বর পেরুর হুয়াচো উপকূলে ভাসতে দেখেন স্থানীয় জেলেরা।

ব্লাঙ্কা অলিভিয়া আরেলানো গুতেরেস নামের ওই নারী চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষের দিকে তার পরিবারের সদস্যদের জানান, তিনি পেরুর রাজধানী লিমায় যাবেন। লিমায় তার অনলাইন প্রেমিক জুয়ান পাবলো জেসুস ভিলাফুয়ের্তের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। পরিচয়ের পর কয়েক মাস ধরে এই তরুণের সাথে অনলাইনে প্রেম করেন তিনি।

তার পরিবার বলেছে, পেরুর হুয়াচো উপকূলে বসবাস করেন আরেলানোর ৩৭ বছর বয়সী প্রেমিক। সেখানে এই প্রেমিকের সাথে সাক্ষাতের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয় তার। গত ৭ নভেম্বর পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা আরেলানোর প্রেমের ব্যাপারে এতটুকুই জানতেন।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম নিউজ করপোরেশ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনা তদন্তে নেমে কর্মকর্তারা দেখতে পান আরেলানোর সাথে সর্বশেষ গত ৭ নভেম্বর কথা বলেছিলেন তার ভাতিজি কারলা আরেলানো। সেই সময় লিমা থেকে আরেলানো জানিয়েছিলেন, ‘তাদের সম্পর্ক বেশ ভালো চলছে। তিনি প্রেমিক জুয়ান পাবলো জেসুস ভিলাফুয়ের্তের প্রেমে মজেছেন।’

সেটিই ছিল আরেলানোর সাথে পরিবারের সদস্যদের সর্বশেষ যোগাযোগ। পরে দুই সপ্তাহ ধরে তার আর কোনও খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি। আরেলানোর কোনও খোঁজ না পেয়ে তার অবস্থান জানার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে আঁকুতি জানিয়ে টুইট করেন ভাতিজি কারলা আরেলানো।

সেই টুইটের সূত্র ধরে লিমার স্থানীয় পুলিশ আরেলানোর খোঁজে তদন্ত শুরু করে। টুইটে তিনি বলেন, আমি এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়বো তা কখনোই চিন্তা করিনি। আজ আমি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজনকে খুঁজে পেতে আপনাদের সহায়তা কামনা করছি।

টুইটে কারলা বলেন, ‘পেরুতে গিয়ে গত ৭ নভেম্বর থেকে আমার ফুফু ব্লাঙ্কা অলিভিয়া আরেলানো গুতেরেস। তিনি মেক্সিকান বংশোদ্ভূত। আমরা তার জীবন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি।’

গত ১০ নভেম্বর হুয়াচো উপকূলের জেলেরা সেখানে একটি বিচ্ছিন্ন আঙুলের খোঁজ পান। এই আঙুলে একটি রূপার আংটি ছিল; যা আরেলানোর পরিবারের জন্য সবচেয়ে খারাপ খবরটি নিশ্চিত করে যে, হত্যার শিকার হয়েছেন তিনি।

এরপর হুয়াচোর একই সমুদ্র সৈকতে একটি মুখবিহীন মাথা, এক হাত এবং একটি ধড় পাওয়া যায়। যার ভেতরে শরীরের কোনও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিল না। সবকিছু বের করে নেওয়া হয়েছিল।

গত ১৭ নভেম্বর ভিলাফুয়ের্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে লিমার পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রধান সন্দেহভাজন হিসাবে মনে করা হয় ভিলাফুয়ের্তেকে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লাতিন নোটিসিয়াসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পেরুর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, জুয়ান পাবলো ভিলাফুয়ের্তকে মানব অঙ্গ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

৩৭ বছর বয়সী এই মেডিক্যাল ছাত্রকে গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পর ভয়াবহ সব তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। আরেলানো নিখোঁজের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে এই মেডিক্যাল শিক্ষার্থীকে মানুষের অগ্ন্যাশয় এবং মগজসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবচ্ছেদের ভিডিও পোস্ট করতে দেখা যায়।

সন্দেহভাজন এই ঘাতকের বাড়িতে তদন্ত চালানোর সময় কর্মকর্তারা তার অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুম, লন্ড্রি রুম এবং তোষকে রক্তের দাগ দেখতে পান।

গত বুধবার এক টুইট বার্তায় আরেলানোর ভাতিজি কারলা বলেন, ‘আমরা যে ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি, তা প্রকাশ করার কোনও ভাষা নেই। আমার ফুফু ছিলেন একজন দানশীল, উষ্ণ হৃদয়ের, আলোকিত, বুদ্ধিমান, নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। আমরা তাকে এভাবেই স্মরণ করব।’

সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।

এসএস