ইসরায়েলের বর্বর হামলায় নিহত হয়েছিল পরিবারের সবাই। কেবল প্রাণে রক্ষা পেয়েছিল এক বালক। এবার চলে গেল সেই প্রাণও। ইসরায়েলি বিমান হামলায় পরিবারের সবাইকে হারানো ১৩ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি বালকের প্রাণ গেল সাহায্য নিতে গিয়ে।

নিহত ওই ফিলিস্তিনি বালকের নাম জেইন ওরোক। বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে যখন ইসরায়েলি বিমান হামলায় জেইন ওরোকের পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন জেইন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল। সেসময় সে আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যায়। তবে সেসময় ইসরায়েলি সেই হামলায় তার বর্ধিত পরিবারের ১৭ জন সদস্য নিহত হয়।

কিন্তু পরিবারের সবাইকে হারিয়ে ১৩ বছর বয়সী জেইন পরবর্তীতে গাজায় নিষ্ঠুর পরিণতির শিকার হয়। মূলত গাজার ফিলিস্তিনিরা গভীরতর মানবিক সংকটের পাশাপাশি ওষুধ, খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন।

গত বছরের অক্টোবর থেকে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল গাজায় নির্বিচার আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে এবং এতে করে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডটির সকল মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এছাড়া অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

হাজার হাজার মানুষ কোনও ধরনের আশ্রয় ছাড়াই বসবাস করছে এবং প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম ত্রাণবাহী ট্রাক এই অঞ্চলে প্রবেশ করছে। এমন অবস্থায় আকাশপথের মাধ্যমে অর্থাৎ বিমান থেকে গাজায় সহায়তা সরঞ্জাম এয়ারড্রপ করা হচ্ছে।

রয়টার্স বলছে, গত সপ্তাহে বিমান থেকে সাহায্য এয়ার ড্রপ চলাকালীন ফিলিস্তিনি এই কিশোর সহায়তাবাহী প্যাকেজের আঘাতের শিকার হয়। মূলত সেসময় সে মটরশুটির ক্যান, কিছু চাল বা আটা হাতে পেতে চেষ্টা করছিল।

জেইনের দাদা আলী ওরোক বলছেন, ‘প্রথমবার যখন বাড়িতে বিমান হামলা হলো, তখন সে তার মাথা, হাতে এবং পায়ে ক্ষত নিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছিলেন।’

নোংরা পানির একটি বড় পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে দাদা আলী ওরোক স্মরণ করেন, কীভাবে জেইন বিমান থেকে ফেলা সহায়তা তথা খাবার পেতে এই পুকুরে সাঁতার কেটে সামনে যেত। এর পরিবর্তে এই সময়ে তার স্কুলে ডেস্কে বসে শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল বলেও জানান তিনি।

কিন্তু মধ্যস্থতাকারীরা চলমান লড়াইয়ে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং ইসরায়েল ও হামাস গাজায় আরও যুদ্ধে চালিয়ে যাওয়ায় অবশেষে জেইন ওরোকের ভাগ্যও শেষ হয়ে গেল।

জেইনের বাবা মাহমুদ বলছেন, ‘প্যারাসুটের মাধ্যমে নিচে পড়ার সময়, সহায়তাবাহী একটি বাক্স তার (জেইনের) মাথায় আঘাত করে। এছাড়াও বাক্সের দিকে ছুটে যাওয়া অন্য লোকজনের মাধ্যমে পদদলিতও হয় সে। বাক্সের দিকে ছুটে চলা লোকজন এই ছেলেটির দিকে মনোযোগ দেয়নি, কারণ তারাও ক্ষুধার্ত ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাক্সের আঘাতে জেইনের মাথা কেটে যায় এবং সে আহত হয়। তার পেলভিস, মাথার খুলি এবং পেটেও ফ্র্যাকচার হয় এবং মানুষের স্রোত বাড়ার সাথে সাথে তার ওপর আরও চাপ বেড়ে যায়।’

পরে জেইনকে অবশ্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার মারা যায় সে।

উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি এই হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণের ফলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ৭৬ হাজারের বেশি মানুষ।

মাহমুদ বলেন, ‘আমার ছেলে খুবই মূল্যবান, সে ছিল আমার শক্তি, আমার জীবন, এই পৃথিবীতে আমার প্রথম আনন্দ, আমার সবচেয়ে বড় সন্তান, সে পরকালে শান্তিতে থাকুক।’

টিএম