জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আশুলিয়ায় ছয় মরদেহ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন আসামির পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। 

সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ আবেদন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

এদিন বিকেল সোয়া ৩টার পর দ্বিতীয়ার্ধের বিচারকাজ শুরু হয়। প্রথমেই তিনটি আবেদন নিয়ে শুনানি করতে চান আইনজীবী মাহদী হাসান। ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলামের হয়ে লড়ছেন তিনি। 

বিচারকাজ বাদ দিয়ে তার তিনটি আবেদন শোনা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাফাই সাক্ষ্য নিয়ে শুনানি করেন মাহদী। এ মামলায় আসামি নিজেই জবানবন্দি দিতে চান বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি। তবে আবেদনে ভুল থাকায় সংশোধন করতে বলা হয়। 

এরপরই দাঁড়ান ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফীর আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান। তার আবেদন ছিল দুটি। এর মধ্যে একটি কাফীর বিরুদ্ধে হওয়া ৯টি মামলার সম্পর্কে জানা। অর্থাৎ এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তলবের জন্য প্রার্থনা করেন তিনি। 

এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, একই ঘটনার ওপর একাধিক মামলা হতে পারে। ওসব মামলার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।

তখন মিজানুর রহমান বলেন, আশুলিয়ার এ ঘটনায় (হত্যার পর মরদেহে আগুন দেওয়া) ভুক্তভোগীদের স্বজনরা আলাদা আলাদা মামলা করেছেন। সেসব মামলা সম্পর্কে আমার জানা প্রয়োজন। 

আপনার ক্লায়েন্ট কি এসব মামলায় আসামি; ট্রাইব্যুনালের এমন প্রশ্নে না সম্বোধন করেন এই আইনজীবী। পরে সাফাই সাক্ষ্য নিয়ে শুনানি করেন তিনি। দুজন জবানবন্দি দিতে চান বলে আদালতের সামনে উল্লেখ করেন মিজানুর রহমান। 

এ পর্যায়ে আপত্তি জানিয়ে এসব আবেদন ও সাক্ষী গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মন্তব্য করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে বলেন, সাফাই সাক্ষ্য দিতে হলে আগে আবেদন করতে হয়। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের সময় দিতে হয়। কিন্তু তারা দেননি।

এ সময় প্রসিকিউশনের উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান বলেন, ‘মি. ইসলাম, অনলি অফেন্স টু দ্য ডিলে দেয়ার ইজ পানিশেবল, হুইচ ইজ দিস সেকশন?’ তখন এ সম্পর্কিত কিছু ধারা পড়ে ট্রাইব্যুনাল মন্তব্য করেন, এখানে ৯টি আবেদন। এসব আবেদন মঞ্জুর করতে গেলে মামলাটি এক বছরেও শেষ হবে না।

প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তারা আইন মেনে করলে আপত্তি নেই।

এরপর আসামিসহ তিনজন সাফাই সাক্ষীর আবেদন নিয়ে শুনানি করেন ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেনের আইনজীবী মিরাজুল। তবে কোনো সাক্ষ্য নেই বলে জানিয়েছেন এসআই আরাফাত উদ্দিনের আইনজীবী হাসান ইমাম।

তাদের শুনানি শেষে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামকে শুনতে চান আদালত। তিনি বলেন, আমাদের সাক্ষী শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এখন সাফাই সাক্ষ্য দিতে চান। অথচ তারা এতদিন ট্রাইব্যুনালের সামনে কিছুই আনেননি। আমাদের অন্ধকারে রেখেছেন।

মামলার এ পর্যায়ে এসে বিচারকে বিলম্ব করতে চাইছেন বলে মন্তব্য করেন এই প্রসিকিউটর। মিজানুল ইসলাম বলেন, তারা আমাদের কিছু না জানিয়েই এসব আবেদন করেছেন। অতএব আবেদন নামঞ্জুরের প্রার্থনা করছি।

তখন ডিফেন্স আইনজীবীদের ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনাদের সব আবেদন পেন্ডিং থাকল। নথিভুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে এ বিষয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার আদেশ দেওয়া হবে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ১৬ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন আটজন। তারা হলেন- ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই আবদুল মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদার। তাদের সোমবার সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছে পুলিশ।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন বিকেলে আশুলিয়ায় গুলিতে প্রাণ হারান ছয় তরুণ। এরপর ভ্যানে তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয় পুলিশ। নৃশংস এ ঘটনার সময় একজন জীবিত থাকলেও বাঁচতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া এর আগের দিন একজন শহীদ হয়েছিলেন। এ ঘটনায় একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়।

এমআরআর/এসএম