ফোনে আড়ি পাতা এবং ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ফোনালাপ যখন মিডিয়ায় ফাঁস করা হয়, তখন ব্যক্তির গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হয়। সামাজিকভাবে ওই ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

সোমবার ফোনে আড়ি পাতা বন্ধে দায়ের করা রিটের শুনানিতে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

আদালত বলেন, মোবাইল ফোনে কথা বলা দুই পক্ষের মধ্যে এক পক্ষ, আবার তৃতীয় পক্ষও ফোনালাপ ফাঁস করতে পারে। তবে এখানে কোন পক্ষের কী স্বার্থ আছে, তা জানি না। ফোনে আড়ি পাতা ঠিক নয়। ফোনালাপ মিডিয়ায় সগৌরবে প্রচার করাও উচিত নয়।

আদালত আরও বলেন, ফোনালাপ যখন মিডিয়ায় ফাঁস করা হয়, তখন ব্যক্তির গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হয়। সামাজিকভাবে ওই ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে কারা ফোনালাপ ফাঁস করে, তা আমরা জানি না। তবে ফোনালাপ ফাঁস করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বিটিআরসিসহ সব পক্ষের সজাগ থাকা দরকার। 

গত ২২ জানুয়ারি ফোনে আড়ি পাতা বন্ধে ৭ দিনের মধ্যে পদক্ষেপ জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের লিগ্যাল নোটিশ পাঠান সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবী। নোটিশে ফোনালাপে আড়ি পাতা প্রতিরোধে আইন অনুযায়ী বিটিআরসি কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৬টি আড়ি পাতার ঘটনা নোটিশে উল্লেখ করা হয়। নোটিশের জবাব না পাওয়ায় এ রিট করা হয়।

রিটকারী আইনজীবীরা হলেন, অ্যাডভোকেট রেজওয়ানা ফেরদৌস, উত্তম কুমার বণিক, শাহ নাভিলা কাশফী, ফরহাদ আহমেদ সিদ্দীকী, মোহাম্মদ নওয়াব আলী, মোহাম্মদ ইবরাহিম খলিল, মুস্তাফিজুর রহমান, জি এম মুজাহিদুর রহমান (মুন্না), ইমরুল কায়েস ও একরামুল কবির।

ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) রিটে বিবাদী করা হয়েছে।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। বিটিআরসির পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রেজা ই রাকিব।

শুনানিতে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩০(চ) ধারা অনুযায়ী টেলিযোগাযোগের একান্ততা রক্ষা নিশ্চিত করা বিটিআরসির দায়িত্ব। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এ ধরনের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা অহরহ ঘটছে। অথচ সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী কমিশন তার দায়িত্ব পালন করছে না। 

তিনি বলেন, সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে আমি, আপনারা বা অ্যাটর্নি জেনারেল কেউই নিরাপদ নই। কখন কার ফোনালাপ কীভাবে ফাঁস হবে, কেউ জানি না। স্বামী-স্ত্রীর ফোনালাপ পর্যন্ত ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি প্রতিরোধে বিটিআরসির কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, যারা রিট আবেদনকারী হিসাবে রয়েছেন, তাদের কারো ক্ষেত্রেই ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। ফলে তারা কেন সংক্ষুব্ধ হলেন? যাদের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা এখানে যুক্ত করা হয়েছে, তারা চাইলে বিটিআরসিতে আবেদন করে প্রতিকার চাইতে পারেন। এছাড়া নিম্ন আদালতে দেওয়ানি মামলা করারও সুযোগ আইনে রাখা হয়েছে। অতএব এ রিট চলতে পারে না, এটি খারিজযোগ্য। 

তিনি বলেন, যখন দুই ব্যক্তির মধ্যে ফোনালাপ হয়, তখন এদের যে কেউ একজন সেটা রেকর্ড করে ফাঁস করতে পারেন। এখানে বিটিআরসির কী করার আছে? সেক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও মামলা করতে পারেন। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ আইনে রয়েছে।

আদালত প্রশ্ন করেন, ফোনালাপ ফাঁস প্রতিরোধ করা সম্ভব কি না।

জবাবে শিশির মনির বলেন, সম্ভব। ডিজিটালভাবে সারা বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। আমরা লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু জবাব না পেয়ে রিট করেছি। শুনানি শেষে আদালত রিটের আদেশের জন্য আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রোববার দিন ধার্য করেন।

এমএইচডি/আরএওইচ