তিন বছরের শিশু সন্তানকে কাছে পেতে হাইকোর্টের এজলাস কক্ষে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন ভারতীয় মা সাদিকা সাঈদ।

মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে তিনি ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

রিট মামলার শুনানির এক পর্যায়ে সাদিকা সাঈদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম আদালতকে বলেন, ‘শিশুর মা ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদ আপনাদের সামনে কিছু কথা বলতে চান। আদালত তাকে কথা বলার অনুমতি দেন।’

তখন এজলাস কক্ষের ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে সাদিকা সাঈদ বলেন, ‘আমার সাবেক স্বামী সানিউর টি আই এম নবী আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের মাধ্যমে আমি আমার সন্তান ফিরে পেতে চাই। এ ক্ষেত্রে আমি শিশুর বাবার সঙ্গে  সন্তানের জিম্মা ভাগাভাগি করতেও রাজি আছি।’

এ সময় আদালত ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদকে ধন্যবাদ জানান।

শুনানি শেষে ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদ ও বাংলাদেশি নাগরিক সানিউর টি আই এম নবীর তিন বছরের শিশুকে নিয়ে বাবার দেশত্যাগের ঘটনায় শিশুর দাদা টিম নবীকে তলব করেছেন হাইকোর্ট। আগামী ৭ ডিসেম্বর তাকে হাজির হতে বলা হয়েছে। শিশুর দাদা যেন দেশত্যাগ না করতে পারে, এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে ফেসবুকে উচ্চ আদালত নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার ঘটনায় তাকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। 

এছাড়া আদালতের আদেশ অমান্য করে শিশুকে নিয়ে দেশত্যাগ করায় বাবা সানিউর টি আই এম নবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। তার বাংলাদেশি পাসপোর্টের কার্যকারিতা সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম। তাকে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম ও ব্যারিস্টার ফাইজা মেহরিন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সেলিম আজাদ।

এর আগে, সোমবার (২২ নভেম্বর) ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদ ও বাংলাদেশি নাগরিক সানিউর টি আই এম নবীর তিন বছরের শিশুকে নিয়ে দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছেন শিশুটির বাবা।

আদালতে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার জানান, ১৬ নভেম্বর সকালে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে শিশুকে নিয়ে বাবা সানিউর টি আই এম নবী অস্ট্রেলিয়া চলে গেছেন।

১৭ নভেম্বর ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদ ও বাংলাদেশি নাগরিক সানিউর টি আই এম নবীর তিন বছরের শিশুসহ পলাতক বাবাকে হাজির করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও গুলশান থানার পুলিশকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ২১ নভেম্বর (রোববার) বিকেল ৩টার মধ্যে তাদেরকে আদালতে হাজির করতে বলা হয়েছিল।

ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

গত ১৬ নভেম্বর ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাঈদের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের তিন বছরের শিশু সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিক বাবা সানিউর টি আই এম নবীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। শিশুকে নিয়ে বাবা সানিউর যেন দেশের বাইরে যেতে না পারেন সেজন্য ইমিগ্রেশন পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। ১৬ নভেম্বর শিশুটির বাবার পক্ষে আইনি লড়াই থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া। 

১৫ নভেম্বর ওই শিশুকে পরদিন ১৬ নভেম্বর সকালের মধ্যে মায়ের আইনজীবীর কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু ওই শিশুর বাবা আইনজীবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। এ কারণে বাবা সানিউরের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া এ মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।

গত ২৫ আগস্ট হাইকোর্ট দুই মাসের জন্য ওই শিশুকে ভারতীয় নাগরিক মা সাদিকা সাঈদের হেফাজতে রাখার আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, মা ও শিশু মানবাধিকার সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ফ্লাড) ব্যবস্থাপনায় থাকবে। তবে বাংলাদেশি বাবা সপ্তাহে তিনদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিশুর সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন। এ দুই মাস সাদিকা সাঈদের পাসপোর্ট গুলশান থানায় জমা রাখতে বলা হয়।

সাদিকা সাঈদের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাইকোর্টের আদেশের পর শিশুর বাবা তার সন্তানকে উন্নত পরিবেশে গুলশান ক্লাবে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শিশুর মঙ্গলের কথা চিন্তা করে আমরাও রাজি হই। গুলশান ক্লাবেই মা ও শিশু অবস্থান করছিলেন। এক পর্যায়ে তিন বছরের ওই শিশুকে বেড়ানোর কথা বলে গুলশান ক্লাব থেকে নিয়ে যান বাবা সানিউর। কিন্তু পরে আর মায়ের কাছে দিয়ে যাননি। এর মধ্যে শিশুর মায়ের বিরুদ্ধে জিডি ও মামলা করেন সানিউর।

বিষয়টি গত ১৪ নভেম্বর হাইকোর্টের নজরে আনা হলে আদালত ১৬ নভেম্বর সকালের মধ্যে শিশুটিকে আদালতে হাজির করতে বলেছিলেন। কিন্তু আদালতের আদেশ প্রতিপালন করা হয়নি।

আইনজীবীরা জানান, ভারতের বিয়ে সংক্রান্ত ওয়েবসাইট থেকে অন্ধপ্রদেশের হায়দরাবাদের সাদিকা সাঈদ শেখ নামে এক মেয়েকে বিয়ের জন্য পছন্দ করেন ঢাকার বারিধারার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান সানিউর টি আই এম নবী। সাদিকা হায়দারাবাদের এক মুসলিম পরিবারের সন্তান।

২০১৭ সালে হায়দারাবাদে তাদের ঘটা করে বিয়ে হয়। বিয়ের পর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে বসবাস শুরু করেন তারা। কয়েক মাস পর ঢাকায় চলে আসেন। এর মধ্যে এই দম্পতির ঘরে ২০১৮ সালে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। এক পর্যায়ে তাদের সংসারে অশান্তি নেমে আসে। সাদিকা শেখকে মারধরও করেন তার স্বামী সানিউর। তাকে ভারতের আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বিষয়টি ভারতে সাদিকার আত্মীয়-স্বজনরা জানতে পারেন। তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে ভারতীয় হাইকমিশনে যোগাযোগ করা হয়। তারপরও সমাধান হয়নি। পরে মেয়েটির বোন মানবাধিকার সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ফ্লাড) কাছে আইনি সহায়তা চান।

গত ৮ আগস্ট সাদিকা শেখ ও তার শিশু সন্তানসহ আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে হেবিয়াস কর্পাস (অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ করে রাখা) রিট করে ফাউন্ডেশন ফর ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ফ্লাড) পরিচালক ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষক লুলান চৌধুরী।

আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ জানান, হাইকোর্টে মামলা দায়ের করার পরপরই বাংলাদেশি নাগরিক সানিউর টি আই এম নবী ভারতীয় নাগরিক সাদিকা সাইদকে ডিভোর্স দেন।

এমএইচডি/ওএফ