বিদায় নিচ্ছে ২০২১ সাল। করোনার কারণে এই বছর উচ্চ আদালতে কখনও ভার্চুয়ালি আবার কখনও শারীরিক উপস্থিতিতে বিচারকাজ চালাতে হয়েছে। তবে বছরজুড়ে আলোচিত বিভিন্ন রিট, মামলা ও রায়ের জন্য মানুষের দৃষ্টি ছিল উচ্চ আদালতের দিকে।

পি কে হালদারকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন আদেশ, দুই শিশুর জাপানি মায়ের আইনি লড়াই, নোবেলজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুস ও ২৮০ ঋণখেলাপিকে হাইকোর্টে তলব, পাবজি-ফ্রি ফায়ার গেম বন্ধের নির্দেশ, বিচারক কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া, হাতিরঝিলের বাণিজ্যিক স্থাপনা অপসারণ, ইভ্যালি পরিচালনায় বোর্ড গঠন, ইজিবাইক চিহ্নিত ও অপসারণসহ বিভিন্ন আলোচিত রায় ও আদেশের কারণে বছরজুড়ে উচ্চ আদালত ছিল সরগরম।

বিদায়ী বছরের সবচেয়ে আলোচিত ছিল পি কে হালদারসহ ২০ জনের সম্পদ জব্দের নির্দেশ / ছবি- সংগৃহীত

পি কে হালদারসহ ২০ জনের সম্পদ জব্দের নির্দেশ

বিদায়ী বছরের ২১ জানুয়ারি প্রায় তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা পাচারের ঘটনায় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারসহ (পি কে হালদার) ২০ জনের সম্পদ, পাসপোর্ট ও ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। অন্যরা হলেন- কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নুরুল আলম, পরিচালক জহিরুল আলম, নাসিম আনোয়ার, বাসুদেব ব্যানার্জি, পাপিয়া ব্যানার্জি, মোমতাজ বেগম, নওশেরুল ইসলাম, আনোয়ারুল কবির, প্রকৌশলী নরুজ্জামান, আবুল হাসেম, মো. রাশেদুল হক, পি কে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, স্ত্রী সুষ্মিতা সাহা, ভাই প্রিতুষ কুমার হালদার, চাচাত ভাই অমিতাব অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারী, ব্যাংক এশিয়ার সাবেক পরিচালক ইরফান উদ্দিন আহমেদ ও পি কে হালদারের বন্ধু উজ্জ্বল কুমার নন্দী। একই সঙ্গে আদালত পি কে হালদারের বক্তব্য প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা দেন।

ধর্ষণ রিপোর্টে অসংগতি : সিভিল সার্জন এসপির ক্ষমা প্রার্থনা

বিদায়ী বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সাত বছরের এক শিশুর ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীর তিনটি মেডিকেল রিপোর্ট ও একটি ছাড়পত্রে অসংগতির ঘটনায় দোষ স্বীকার করে আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ ও পুলিশ সুপার (এসপি) আনিছুর রহমানসহ ১১ জন।

বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে হাজির হয়ে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর শিশুটির বাবা এক কিশোরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় কিশোরটির বয়স ১৫ বছর উল্লেখ করা হলেও ডাক্তারি পরীক্ষায় তার বয়স ১১ বছর নির্ধারিত হয়। এর আগে ধর্ষণের শিকার শিশুটির ডাক্তারি পরীক্ষা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিভিল সার্জন কার্যালয় বিপরীতমুখী প্রতিবেদন দেয়। আসামির জামিন আবেদনের ওপর শুনানিতে দাখিল করা নথিতে ধর্ষণের ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদনে নানা অসামঞ্জস্য থাকায় সিভিল সার্জনসহ নয় চিকিৎসক এবং মামলার তদন্তে গাফিলতি হওয়ায় পুলিশ সুপারসহ তিন কর্মকর্তাকে তলব করেন আদালত।

ঋণখেলাপি ২৮০ ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে তলব

বিদায়ী বছরে ঋণখেলাপি ২৮০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে তলবের বিষয়টি ছিল উচ্চ আদালতের একটি আলোচিত ঘটনা। গত ২১ জানুয়ারি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে পাঁচ লাখ টাকা ও তার বেশি অর্থঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া এমন ২৮০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তলব করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

অবসায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা পিপলস লিজিংয়ের সাময়িক অবসায়ক (প্রবেশনাল লিকুইডেটর) মো. আসাদুজ্জামান খানের দেওয়া এ সংক্রান্ত তালিকা দেখে আদালত এমন আদেশ দেন।

মো. আসাদুজ্জামান খানের পক্ষে আদালতে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মেজবাহুর রহমান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঋণগ্রহীতা ৫০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা গত বছরের ২৩ নভেম্বর আদালতে দাখিল করা হয়। ওই ঋণগ্রহীতাদের তালিকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা ও তার বেশি অর্থঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া ২৮০ জনকে কারণ দর্শাতে বলেন আদালতে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানাতে ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে ২৮০ ঋণখেলাপি পর্যায়ক্রমে হাজিরা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করেছেন। অনেকে আবার ঋণ পরিশোধে আদালতের কাছ থেকে সময় নিয়েছেন।

আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করায় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও তলব করেন হাইকোর্ট/ ফাইল ছবি

নোবেলজয়ী ড. ইউনূসকে তলব

২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ টেলিকমে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তলব করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভার্চুয়ালি হাজির হয়ে আদালত অবমাননার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন।

হাজি সেলিমের ১০ বছর কারাদণ্ড বহাল

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুই যুগ আগের একটি মামলায় চলতি বছরের (২০২১ সাল) ৯ মার্চ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের ১০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও বহাল রাখা হয়। টাকা পরিশোধ না করলে তাকে আরও এক বছর কারাভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আ.লীগের সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের কারাদণ্ড বহাল রাখার ঘটনাও বেশ আলোচনার জন্ম দেয় / ছবি-সংগৃহীত

তবে, সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বিচারিক আদালত হাজি সেলিমকে যে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সেই অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় উচ্চ আদালত ওই অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেন।

বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ রিমুভ করতে নির্দেশ

২০২১ সালের ১৭মার্চ আল-জাজিরা টেলিভিশন নেটওয়ার্কে প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে তাৎক্ষণিক সরানোর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। নির্দেশনায় ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম কর্তৃপক্ষ যেন প্রতিবেদনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অনলাইন থেকে সরিয়ে ফেলে এবং পুনরায় আপলোড যেন না করে সে বিষয়ে অনুরোধ জানাতে বলা হয়।

বিটিআরসি-কে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরায় গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্প্রচারিত হয়। প্রতিবেদনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। সরকারিভাবে ওই প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দুর্ব্যবহার : কুষ্টিয়ার এসপির ক্ষমা প্রার্থনা

গত ২৪ জানুয়ারি কুষ্টিয়া ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের সময় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় হাইকোর্টে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন কুষ্টিয়ার ওই সময়ের পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাত।

এর আগে (গত ২০ জানুয়ারি) দুর্ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাতকে তলব করেন হাইকোর্ট।

হাতিরঝিলে সব ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদসহ ১০ দফা নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট / ছবি- সংগৃহীত

হাতিরঝিলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ

বিদায়ী বছরের ৩০ জুন হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি প্রকল্পে সব ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদসহ ১০ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। এই বিষয়ে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এমন রায় দেন।

পাবজি-ফ্রি ফায়ার গেম বন্ধে নির্দেশ

গত ১৬ আগস্ট দেশের সব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো ক্ষতিকারক গেম বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।

দেশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকটক, বিগো লাইভ, পাবজি, ফ্রি ফায়ার, লাইকিসহ এই ধরনের অনলাইন গেম ও অ্যাপ বন্ধ করে অবিলম্বে অপসারণের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা চেয়ে গত ২৪ জুন মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের পক্ষে রিটটি করা হয়।

দেশের সব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো গেম বন্ধেরও নির্দেশ দেন হাইকোর্ট / ফাইল ছবি

রিটের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির জানান, দেশের সব অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো ক্ষতিকারক গেমের লিংক-গেটওয়ে তিন মাসের জন্য বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাবজি, ফ্রি ফায়ার, লাইকি, বিগো লাইভসহ ক্ষতিকারক সব গেম ও লাইভ স্ট্রিমিং অ্যাপ দেশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে অপসারণ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া অনলাইন গেমস-অ্যাপ তদারকি এবং এই বিষয়ে গাইডলাইন তৈরি করতে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা–ও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগসচিব, বিটিআরসির চেয়ারম্যান, শিক্ষাসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনসচিব, স্বাস্থ্যসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিবাদীদের ১০ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। ওই সব গেম ও অ্যাপের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়ে ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের পক্ষে ১৯ জুন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশের জবাব না পেয়ে রিটটি করা হয়।

দুই শিশু নিয়ে জাপানি মায়ের আইনি লড়াই

গত চার মাস ধরে জাপানি শিশু জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনার জিম্মা নিয়ে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই চলছে। হাইকোর্ট থেকে এই আইনি লড়াই এখন আপিল বিভাগে চলমান। সর্বশেষ গত ১৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ আদেশে বলেছেন, শিশু জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা আগামী ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত জাপানি মা নাকানো এরিকোর কাছে থাকবেন। এই সময় শিশুদের নিয়মিত স্কুলে নিয়ে যেতেও বলা হয়েছে।

বিদায়ী বছরে উচ্চ আদালতে দুই শিশু নিয়ে জাপানি মায়ের আইনি লড়াই বেশ আলোচনার জন্ম দেয় / ছবি- সংগৃহীত

তবে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে যেকোনো সময় বাংলাদেশি বাবা ইমরান শরীফ শিশুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। ৩ জানুয়ারি পরবর্তী আদেশ দেবেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ ওই আদেশ দেন।

গত ৫ ডিসেম্বর দুই শিশুকে নিজের জিম্মায় নিতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন জাপানি মা নাকানো এরিকো। ২১ নভেম্বর শিশু দুটি বাংলাদেশে তাদের বাবা ইমরান শরীফের কাছে থাকবে বলে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, তবে জাপান থেকে এসে মা বছরে তিনবার ১০ দিন করে দুই সন্তানের সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে পারবেন। জাপানি মায়ের আসা-যাওয়া ও থাকা-খাওয়ার সব খরচ বাবা ইমরান শরীফকে বহন করতে হবে।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিলেন আপিল বিভাগ

বিদায়ী বছরের ২২ নভেম্বর স্থগিতাদেশ থাকার পরও ধর্ষণ মামলার এক আসামিকে জামিন দেওয়ায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর সাবেক বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেন (সিজ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এই আদেশ দেন।

সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রসঙ্গত, বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় ৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণ মামলা নেওয়া যাবে না মর্মে  পর্যবেক্ষণ দিয়ে আলোচনায় আসেন বিচারক কামরুন্নাহার। ওই অভিযোগে তাকে বিচারকাজ থেকে প্রত্যাহার করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। যদিও লিখিত রায়ে বিতর্কিত পর্যবেক্ষণ বাদ দেন তিনি। এরপরই আলোচনায় আসে তিন বছরের পুরনো এক ধর্ষণ মামলায় আসামির জামিনকাণ্ড। যার ধারাবাহিকতায় তাকে তলব করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

এর আগে ১৪ নভেম্বর কামরুন্নাহারের ফৌজদারি বিচারিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। একই সঙ্গে তাকে এজলাসে না বসার নির্দেশ দেওয়া হয়।

ইভ্যালির ব্যবস্থাপনায় গঠিত বোর্ড কী ধরনের কাজ করবে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট

ইভ্যালি পরিচালনার জন্য বোর্ড গঠন

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি পরিচালনার জন্য গত ১৮ অক্টোবর আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করে দেন  হাইকোর্ট। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন- স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ রেজাউল আহসান, ওএসডিতে থাকা আলোচিত অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফখরুদ্দিন আহম্মেদ, কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ব্যবস্থাপনায় গঠিত বোর্ড কী ধরনের কাজ করবে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, লিখিত আদেশ পাওয়ার পরপরই তারা বোর্ড মিটিংয়ে বসবেন। কোথায় কী আছে সবকিছু বুঝে নেবেন। কোম্পানি যেভাবে চলে, সেভাবে প্রথমে বোর্ড মিটিং বসবে। তাদের (বোর্ড) দায়িত্ব হলো টাকাগুলো কোথায় আছে, কোথায় দায় আছে, তা দেখা। কমিটি বসে বিষয়গুলো দেখবে।

সবকিছু বিবেচনার পর বোর্ড যদি দেখে প্রতিষ্ঠানটির চলার যোগ্যতা নেই, তখন অবসায়নের জন্য প্রসিড (প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া) করবে। আর যদি বলে চালানো সম্ভব, তাহলে চলবে।

অনিবন্ধিত সুদের ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ

বিদায়ী বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে অনুমোদনহীন সুদের কারবারি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। একই সঙ্গে অননুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনেরও নির্দেশনা দেন আদালত। তদন্তকালীন কোনো অননুমোদিত বা লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক সেগুলো বন্ধ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি জাকির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। এছাড়া চড়া সুদে ঋণ দেওয়া স্থানীয় মহাজনদের তালিকা দিতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটিকে নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। একটি জাতীয় দৈনিকে ‘চড়া সুদে ঋণের জালে কৃষকেরা’ শিরোনামে গত ২৮ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক রিটটি দায়ের করেন।

রাজারবাগ পীরের কর্মকাণ্ড সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে নির্দেশ

রাজারবাগ দরবারের পীর দিল্লুর রহমান, তার সহযোগী ও অনুসারীদের কার্যক্রম ‘জঙ্গিদের কার্যক্রমের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ’ বলে হাইকোর্টে দেওয়া এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ ডিসেম্বর মামলার তদন্তের স্বার্থে সিআইডি, কাউন্টার টেররিজম ও দুদক চাইলে রাজারবাগ দরবার শরীফের পীরসহ চারজনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে বলে আদেশ দেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে রাজারবাগ দরবার শরীফ ও পীরের কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে কাউন্টার টেররিজমকে নির্দেশ দেন আদালত।

প্রসঙ্গত, দেশের ছয়টি জেলায় পৃথক ৩৪টি মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ এনে রাজারবাগের পীর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা চেয়ে আট ব্যক্তি হাইকোর্টে একটি রিট করেন। এছাড়া ধর্ষণ, মারধর, চুরি, মানবপাচারসহ নানা অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় করা ৪৯ মামলার চক্করে পড়ে রাজধানীর শান্তিবাগের বাসিন্দা ব্যবসায়ী একরামুল আহসান আরেকটি রিট করেন।

পুলিশের অপরাধ তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন

বিদায়ী বছরের ২৮ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন পুলিশ তদন্ত কমিশন গঠন করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শতাধিক আইনজীবী এ সংক্রান্ত রিট দায়ের করেন।

পরীমণির কেন বারবার রিমান্ড; দুই বিচারকের কাছে ব্যাখ্যা তলব করেন উচ্চ আদালত / ছবি- সংগৃহীত

পরীমণিকে বারবার রিমান্ড : দুই বিচারকের কাছে ব্যাখ্যা তলব

বিদায়ী বছরের ৪ আগস্ট রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিন দফায় মোট সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় পরীমণিকে। ৫ আগস্ট প্রথম দফায় চার দিন, ১০ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় দুই দিন এবং ১৯ আগস্ট তৃতীয় দফায় আরও এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয় তার।

পরীমণিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনায় দুই বিচারক দেবব্রত বিশ্বাস ও আতিকুল ইসলামকে গত ২ সেপ্টেম্বর তলব করেন হাইকোর্ট। গত ৩১ অক্টোবর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চে তারা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

পারিবারিক আদালত অবমাননার শাস্তির বিধান কঠোর করতে রায়

দেশের পারিবারিক আদালতগুলোর আদেশ/রায় অবমাননায় শাস্তির বিধান সংশোধন করে আরও কঠোর করার পরামর্শ দেন হাইকোর্ট। গত ২৭ নভেম্বর বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের সাক্ষরের পর এ সংক্রান্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, পারিবারিক আদালতগুলোর বিভিন্ন আদেশের মধ্যে বিশেষত শিশুসন্তানকে দেখা-সাক্ষাতের আদেশ সংশ্লিষ্ট পক্ষ মানছে না। ফলশ্রুতিতে তারা হাইকোর্টে এসে হেবিয়াস করপাস (এক প্রকারের রিট) অধিক্ষেত্রে এসে আশ্রয় (রিট দায়ের) গ্রহণ করছেন।

রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শিশুসন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত সম্পর্কিত মামলাগুলো যাতে ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়, সে বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হলো। আইন মন্ত্রণালয় সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের ১৯ ধারা অনুযায়ী, পারিবারিক আদালতকে অবমাননা করা হলে অবমাননাকারীকে মাত্র ২০০ টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। সময়ের বাস্তবতায় পারিবারিক আদালত অবমাননায় শাস্তির বিধানটি সংশোধন করে আরও কঠোর করতে হবে। এক্ষেত্রে দেওয়ানি জেল ও পর্যাপ্ত জরিমানার বিধান প্রণয়ন সময়ের বাস্তবতা। আদালত প্রত্যাশা করে সরকারের নীতি নির্ধারক মহল এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অবিলম্বে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০ বইয়ের মালিকানা নির্ধারণ

সেবা প্রকাশনীর পাঠকপ্রিয় ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বইয়ের মালিকানা কার, সে বিষয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। গত ১৩ ডিসেম্বর বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ে উল্লেখ করেন, মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি বইয়ের স্বত্ব আব্দুল হাকিমের, কাজী আনোয়ার হোসনের নয়।

বইগুলোর লেখক হিসেবে শেখ আবদুল হাকিমের পক্ষে কপিরাইট অফিসের দেওয়া সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে সেবা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী কাজী আনোয়ার হোসেন রিটটি দায়ের করেন।

সারা দেশের অবৈধ থ্রি হুইলার ইজিবাইক চিহ্নিত ও অপসারণেরও নির্দেশ দেন হাইকোর্ট/ প্রতীকী ছবি

অবৈধ ইজিবাইক চিহ্নিত অপসারণের নির্দেশ

সারা দেশের অবৈধ থ্রি হুইলার ইজিবাইক চিহ্নিত ও অপসারণ করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১৫ ডিসেম্বর বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এমন আদেশ দেন।

অবৈধ থ্রি হুইলার ইজিবাইক আমদানি ও উৎপাদন থেকে বিরত রাখতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা রুলে জানতে চাওয়া হয়। শিল্পসচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতুসচিব, পরিবেশসচিব, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

বাঘ ইকো মোটর লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি রিটটি দায়ের করেন।

এছাড়া বিদায়ী বছরের শেষের দিকে ইভ্যালিকাণ্ডে অভিনেত্রী মিথিলা ও শবনম ফারিয়ার জামিন, পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীনতার ঘোষণা অন্তর্ভুক্তি, মদকে মাদকদ্রব্য না বলাসহ বিভিন্ন রুল ও আদেশের কারণে উচ্চ আদালত ছিল আলোচনায়।

এমএইচডি/ওএফ/এমএআর/