গায়ে আগুন দিয়ে ব্যবসায়ী গাজী আনিসের মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিন ও পরিচালক ফাতেমা আমিন তাদের উত্তরার বাসা থেকে পালিয়ে অন্যত্র আত্মগোপন করেন। মঙ্গলবার (৫ জুলাই) সন্ধ্যার পর তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। 

বুধবার (৬ জুলাই) দুপুরে গাজী আনিসের সঙ্গে আমিন-ফাতেমা দম্পতির ব্যবসায়িক লেনদেন, বিনিয়োগসহ সার্বিক বিষয়ে কারওয়ান বাজারের র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন সংস্থাটির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গত ৪ জুলাই বিকেল পৌনে ৫টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় গাজী আনিস নিজের গায়ে পেট্রোল জাতীয় দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। আগুনে তার শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৫ জুলাই) সকাল সোয়া ৬টায় তিনি মারা যান। ওই ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-৯। মামলার পর র‌্যাব জড়িতদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় এবং র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৩ এর সমন্বয়ে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আসামি নুরুল আমিন (৫৫) ও ফাতেমা আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কমান্ডার মঈন জানান, ২০১৭ সালে আমিন গ্রুপের কর্ণধার নুরুল আমিন এবং তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের সঙ্গে ভিকটিমের পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে ভিকটিমের সখ্য গড়ে ওঠে। ২০১৮ সালে আমিন দম্পতি চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী একটি দেশে যান। সেখানে স্থানীয় একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থানের সময় গাজী আনিসকে হেনোলাক্স কোম্পানিতে বিনিয়োগের জন্য প্ররোচিত করেন তারা। প্রথমে অসম্মতি জানালেও পরে রাজি হন এবং প্রাথমিকভাবে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন গাজী আনিস। তাদের প্ররোচণায় ভিকটিম আরও ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন।

তিনি বলেন, অধিকাংশ টাকাই ভিকটিম ঋণ হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ধার নিয়েছিলেন। বিনিয়োগ করার সময় পরস্পরের প্রতি সম্মান এবং বিশ্বাসের কারণে তাদের মধ্যে কোনো চুক্তিনামা করা হয়নি। পরে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি চুক্তিপত্র করতে নুরুল আমিন গড়িমসি করতে থাকেন। এক পর্যায়ে প্রতিমাসে বিনিয়োগের লভ্যাংশ দেওয়াও বন্ধ করে দেন। কয়েকবার আনিসকে হেনস্তা-ভয়ভীতিও প্রদর্শন করা হয়।

টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার আদালতে দুটি মামলা দায়ের করেন গাজী আনিস। এছাড়া টাকা ফিরে পাওয়ার জন্য গত ২৯ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। এরপর ৩১ মে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে পাওনা টাকা আদায় সংক্রান্ত মামলা দায়েরের বিষয়টি পোস্ট করেন। বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে সহায়তা চান।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৪ জুলাই পাওনা টাকা পরিশোধের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু বিকেল গড়ালেও আমিন-ফাতেমা দম্পতি গাজী আনিসকে টাকা দেননি। এরপর গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। মঙ্গলবার তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

নিহত গাজী আনিস কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার পাশাপাশি একটি টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করতেন। পরে চাকরি ছেড়ে কুষ্টিয়ায় গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। তিনি সাহিত্য চর্চা করতেন এবং তার বেশ কয়েকটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে।

আসামি নুরুল আমিন ১৯৮১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঢাকার গোপীবাগ এলাকায় কাদের হোমিও হল নামে হোমিও হলে ১৫ বছর চাকরি করেন। ওই সময়ে কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথা মাথায় এলে ১৯৯১ সালে হেনোল্যাক্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসা শুরু করেন। পরে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি নামে নামকরণ করেন। ওই কোম্পানির অধীনে হেনোলাক্স কসমেটিকস্ যেমন হেনোলাক্স স্পট ক্রিম, হেনোলাক্স মেছতা আউট ক্রিম ও হেনোলাক্স হেয়ার অয়েল এবং পোল্ট্রি ফার্মের ব্যবসা করেন।

পরে বাজারে হেনোলাক্সের চাহিদা কমে গেলে ২০০৯ সালে তিনি আমিন হারবাল নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসা শুরু করেন এবং ২০১৬ সালে হেনোলাক্সের ব্যবসা বন্ধ করে দেন। তাদের কাকরাইলে একটি ফ্ল্যাট, পুরানা পল্টনে স্কাই ভিউ হেনোলাক্স সেন্টার নামে একটি ১০ তলা ভবন, পিংক সিটিতে ১টি ডুপ্লেক্স বাড়ি, মেরাজনগর কদমতলীতে হেনোলাক্স নামে ৪ তলা ভবন, মোহাম্মদবাগ কদমতলী এলাকায় হেনোলাক্স ফ্যাক্টরি রয়েছে। বর্তমানে ওই ফ্যাক্টরিতে খান ফুড প্রোডাক্টস, বন্যা ফুড প্রোডাক্টস ও জে কে এগ্রো ফুড নামে তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় তাদের উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

গ্রেপ্তার হওয়া ফাতেমা আমিন একটি বেসরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ থেকে ডিএইচএমএস সম্পন্ন করে তার স্বামীর আমিন হোমিও হলে প্রথমে এক বছর হোমিও চিকিৎসা করেন। তিনি তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি তার স্বামীর আমিন হারবাল কোম্পানির দেখাশোনা করেন।

গাজী আনিস ছাড়াও অন্য কেউ আসামিদের কাছ থেকে টাকা পাবে কি না জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, আমরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাইনি।

পাওনা টাকা আসলে কতো কেনই বা পরিশোধ করা হচ্ছিল না জানতে চাইলে তিনি বলেন, গাজী আনিসের সঙ্গে লেনদেনে টাকার পরিমাণ নিয়ে আসামিদের আপত্তি আছে। লেনদেন হয়েছে তা তারা স্বীকার করেছেন। বিভিন্ন সময়ে চেকে ও নগদে ৭৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন বলে দাবি তাদের। তবে গাজী আনিসের লভ্যাংশসহ ন্যায্য পাওনা প্রায় তিন কোটি টাকা। এটা নিয়েই মূলত তাদের মধ্যে একাধিকবার বাগবিতণ্ডাও হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত দুজনের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন বলে জানান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

জেইউ/জেডএস