আরবি মাস মহররম এলেই শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কারবালা প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)— এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.)—এর শাহাদাতের শোককে ধারণ করতে এ তাজিয়ার আয়োজন করা হয়।

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও শোক প্রকাশে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে রাজধানীর ফরাশগঞ্জের বিবিকা রওজায়। আগামী ৮ আগস্ট (৯ মহররম) এখানকার শিয়া মুসলিমরা পায়ে হেঁটে মিছিল করবেন এবং ৯ আগস্ট (১০ মহররম) তারা দৌড়ে দৌড়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে তাজিয়া মিছিল করবেন।

বিবিকা রওজার শিয়ারা বিশ্বাস করেন, ইমাম হোসেন (রা.) যখন কারবালার ময়দানে শহীদ হন, তখন তার মা মহানবী (স.)—এর কন্যা ফাতেমা (রা.) ছেলেকে দেখতে অদৃশ্যভাবে ছুটে আসেন কারবালায়। তিনি এসে তার শহীদ সন্তান হোসেনকে দেখে যান। একে বলা হয় ‘মারেফত’। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মহররম মাসের ১০ তারিখ তথা আশুরার দিনকে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে পালন করেন শিয়া মুসলমানরা।

শুক্রবার (৫ আগস্ট) বিবিকা রওজায় সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে লোকজন আসছেন জিয়ারতের জন্য। শুক্রবার বিশেষ করে মহররম মাস এলে ভক্তরা বেশি আসেন। সারাদেশ থেকে বিভিন্ন ধর্মের নানা বয়সের লোক এখানে আসেন রওজা জিয়ারতে। নানা রকম মানত, জিয়ারত ও আত্মতৃপ্তির জন্য তারা এখানে আসেন।

নারী ও পুরুষের জন্য বিবিকা রওজায় আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে নারীদের আনাগোনা বেশ। সবাই তাদের মানতের টাকা চেরাগী বাক্সে দেন। ভক্তরা মহররমের ১ তারিখ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মানত করেন। যদি মানত পূর্ণ হয়, তাহলে তারা বিবিকা রওজায় এসে মানত আদায় করেন। অনেকে প্রতীকী রওজার চারপাশে তাওয়াফ করেন। কেউ কেউ নামাজ পড়েন, আবার কেউ রওজা ধরে বিভিন্ন প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করেন।

বিবিকা রওজার মোতাওয়াল্লি ও খাদেম বাবলু মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৯ মহররম বাদ মাগরিব প্রথম মিছিল হবে। হেঁটে হেঁটে মিছিলটি বিবিকা রওজা থেকে শুরু হয়ে পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, লক্ষ্মীবাজার, ডাইলপট্টি ও সূত্রাপুর হয়ে রওজায় এসে সমাপ্ত হবে। এদিন মিছিল হবে ঘোড়া নিয়ে। এ ঘোড়াকে বলা হয় দুলদুল ঘোড়া। শিয়া মুসলিমদের পাশাপাশি সারাদেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষেরা এ তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে এবং মাজার জিয়ারতে আসবেন বিবিকা রওজায়।

তিনি বলেন, ১০ মহররম দৌড়ে দৌড়ে মিছিল হবে। মিছিলটি সদরঘাট হয়ে মিটফোর্ড হয়ে আজিমপুর ও নিউমার্কেট হয়ে ঝিগাতলার বিডিআর গেটে গিয়ে শেষ হবে। তাজিয়া মিছিলের প্রতীক থাকবে একটি ঘর। আর সেই ঘরের ভেতর ইমাম হাসান ও হোসেনের প্রতীকী কবর থাকবে। আর সবার হাতে থাকবে নিশান। তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। ৯ মহররম কাজ শেষ হবে।

তিনি আরও জানান শত শত বছর ধরে ইমাম হোসেন (রা.) শহীদ হওয়ার দিনটিকে ঘিরে তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। এ মিছিল মূলত শোক মিছিল। তার মৃত্যুতে শোক জানাতেই প্রতিবছর তাজিয়া মিছিল বের হয়। সেদিন মিছিল দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। 

তাজিয়া তৈরি করা হয় ইমাম হোসেন (রা.)- এর সমাধির আদলে। তাজিয়া মিছিলে ভক্তরা শোকের গান গাইতে গাইতে বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে মাতম করেন। হোসেনের স্মৃতি স্মরণে তারা গায়ে রঙ লাগিয়ে কারাবালার রক্তপাতের দৃশ্যের অবতারণা করেন। তাদের অনেকে নিজের দেহে ছুরি দিয়ে আঘাত করে রক্ত ঝরিয়ে মাতম করেন।

রাজধানীর সবচেয়ে পুরনো ইমামবাড়া পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের ‘বিবিকা রওজা’। এটি ১৬শ সালে নির্মিত হয়।  মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)— এর কন্যা ও ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলীর বিবি মা ফাতেমা (রা.)—এর নামে নির্মিত এ রওজা।

প্রতিবছর মহরম মাসের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত সময়ে আশুরা উপলক্ষে জমজমাট হয়ে ওঠে বিবিকা রওজা। জানা গেছে, শত শত বছর ধরে বাঙালি শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা ইমাম হোসেন (রা.)-এর মৃত্যু স্মরণে তাজিয়া মিছিলে কারবালার চিত্র দৃশ্যায়ন করে আসছেন।

ঢাকায় কবে থেকে তাজিয়া মিছিল শুরু, তার সঠিক ইতিহাস না পাওয়া গেলেও লোকমুখে জানা যায়, ১৬শ সালে প্রথম ইমামবাড়া বিবিকা রওজা প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশত বছর পর থেকে তাজিয়া মিছিল শুরু হয়।

আইবি/আরএইচ