চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪০ বছর আগে ২০০ পাহাড় ছিল, যার ৬০ শতাংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে সিডিএ ১৫টি পাহাড় কেটে ফৌজদারহাট-বায়েজিদ বাইপাস সড়ক নির্মাণ করেছে। এছাড়া দেশের অন্যতম প্রধান নদী কর্ণফুলী, হালদা ও সাংগু দখল, দূষণ, ভরাট, চর জাগা এবং পরিকল্পিত ড্রেজিং না করায় ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে বলে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে।

শনিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়েজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে চট্টগ্রামের ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম। জঙ্গল সলিমপুরসহ চট্টগ্রামের সব পাহাড় সংরক্ষণ ও নদী রক্ষার দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বলেন, আমরা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত এসব পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ করতে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সভা, সমাবেশ, মিছিল, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারে কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। তারপরও গত ২ যুগে এই অঞ্চলে ভূমিদস্যুরা প্রায় ৪০ শতাংশ এবং শহরে ৬০ শতাংশ পাহাড় কেটে ধ্বংস করে ফেলেছে। সেই সঙ্গে এসব পাহাড়ে গড়ে তুলেছে হাজার হাজার অবৈধ ঘরবাড়ি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে জঙ্গল সলিমপুর ও আলিনগরসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে গড়ে তোলা সব অবৈধ বসতি দ্রুত উচ্ছেদ করার জোর দাবি জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে ভূমিহীনদের যেভাবে জায়গাসহ ঘর উপহার দিচ্ছেন সেই নিয়মে চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করা প্রকৃত ভূমিহীনদের ঘরসহ পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক প্রদত্ত উচ্ছেদ নোটিশ অনুযায়ী দেশের অর্থনীতির হৃৎপিন্ড কর্ণফুলী নদীর দু’পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে তোলা সব স্থাপনা উচ্ছেদের আবারো জোর দাবি জানাচ্ছি। চট্টগ্রাম শহরের শত শত টন বর্জ্য ও পলিথিন কর্ণফুলী নদীতে পড়তে না পারে সে বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি।

এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর মা মাছ রক্ষা, দূষণ রোধ এবং বিপন্ন প্রজাতির
ডলফিন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ও আর এস শিট অনুসারে চট্টগ্রাম শহরের ৭২টি খাল চিহ্নিত করে বিলুপ্ত এবং দখল করা সকল খাল উদ্ধারের জোর দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পাহাড় হচ্ছে পৃথিবীতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় খুঁটির মতো। যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করার পাশাপাশি মানুষ এবং জীববৈচিত্র্যের সুপেয় পানির আধার। ক্রমাগত পাহাড় ধ্বংস হয়ে গেলে চট্টগ্রাম মহানগরী পরভূমিতে পরিণত হবে। ক্রমবর্ধমান ইট কংক্রিটের সৃষ্ট উত্তাপ পরিশোধন করার বিকল্প না থাকায় নগরীর তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাবে। পাহাড় কেটে আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন করে মানুষ যতটুকু আর্থিক লাভবান হচ্ছে বাস্তবে প্রাকৃতিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। চট্টগ্রামে বর্তমানে টিকে থাকা পাহাড়গুলো রক্ষায় জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিডিএ, সিটি করপোরেশন এক হয়ে ২০০৭ সালে শক্তিশালী পাহাড় রক্ষা কমিটি প্রদত্ত সুপারিশ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। 

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের ৮৮টি পাহাড় পুরোটাই বিলুপ্ত হয়েছে। একই সময়ে আংশিক কাটা হয়েছে ৯৫টি। এরপরের ১২ বছরে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পাহাড় নিধন।

২০১১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, বেশিরভাগ পাহাড় কাটা হয় পাহাড়তলী, খুলশী, বায়েজিদ, লালখান বাজার মতিঝরনা, ষোলশহর ও ফয়স লেকে। ১৯৭৬ থেকে ৩২ বছরে চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের ৮৮টি পাহাড় সম্পূর্ণ এবং ৯৫টি আংশিক কেটে ফেলা হয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৭৬ সালে নগরের পাঁচ থানা এলাকায় মোট পাহাড় ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে তা কমে হয় ১৪ দশমিক শূন্য দুই বর্গকিলোমিটার। এ সময়ে ১৮ দশমিক ৩৪৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কাটা হয়। এটা মোট পাহাড়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ। নগরের বায়েজিদ, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালি ও পাহাড়তলী থানা এলাকায় এসব পাহাড় কাটা হয়। সবচেয়ে বেশি ৭৪ শতাংশ কাটা পড়ে পাঁচলাইশে।

এতে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য প্রফেসর মোজাম্মেল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া, বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাসের সভাপতি চৌধুরী ফরিদ প্রমুখ। 

কেএম/জেডএস