পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফসিএল) প্রায় ১৬০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দায়ের করা মামলা দুটিতে ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাগুলো দায়ের করেছেন। রোববার (২৮ ফেব্রুয়ারি) মামলা দুটি দায়ের করা হলেও মঙ্গলবার (২ মার্চ) সংস্থাটির জনসংযোগ দপ্তর বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

দুদক সূত্রে জানা যায়, প্রথম মামলায় পিপলস লিজিং থেকে ঋণের নামে ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে শামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেটের পরিচালক শামসুল আরেফিন আলামিন, তার স্ত্রী ও পিপলস লিজিংয়ের সাবেক পরিচালক নাসরিন আরেফিন আলম, শামসুল আরেফিন আলামিনের বড় ভাইয়ের স্ত্রী ও লিজিংয়ের সাবেক পরিচালক হুমায়রা আল-আমিনসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় মামলায় ঋণের নামে ৯৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-এর সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, সাবেক ডিএমডি তারিক চৌধুরী ও কবীর মোস্তাক আহমদসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শামসুল আলামিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন আলামিন বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ঋণের ৯৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এমন সময় মামলা করা হলো, যখন আমি পিপলস লিজিংকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছি। আদালতের নির্দেশনা মেনে অডিটর নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। অডিট টিম কাজও শুরু করেছে। দায়ীদের শনাক্ত করা হবে।

এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পি কে হালদারের সহযোগী পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফসিএল) চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দীর জবানবন্দিতে নানা আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে শামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেটের পরিচালক শামসুল আরেফিন আলামিন, পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সিমটেক্সের সিদ্দিকুর রহমান, জেড এ অ্যাপারেলসের মো. জাহাঙ্গীর আলম, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক শহীদ রেজা, বান্ধবী নাহিদা রুনাই, আল মামুন সোহাগ, রাফসান রিয়াদ চৌধুরী, সৈয়দ আবেদ হাসানসহ প্রায় ৪০ থেকে ৪২ জনের নাম উঠে আসে বলে জানা গেছে।

জবানবন্দিতে উজ্জ্বল কুমার নন্দী বলেন পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ৬৬ কাঠা জমি বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে অনিয়ম হয়। জমিটি পি অ্যান্ড হাল ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করা হলেও পিপলস লিজিংয়ে জমির টাকা পরিশোধ হয়েছে কাগুজে প্রতিষ্ঠান লিপরো ইন্টারন্যাশনাল, হাল এন্টারপ্রাইজ, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, হাল ট্রাভেল ও এফএএস লিজিং থেকে। সবই পরোক্ষভাবে পি কে হালদারের কোম্পানি। জমি বিক্রির ১২০ কোটি টাকা পিপলস লিজিংয়ে স্থানান্তর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব টাকা আবার ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস লিজিংয়ে স্থানান্তর হয়েছে। ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেম এ জমিটি বিক্রি বাবদ ৬ কোটি টাকা এবং চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার জন্য ১২ কোটি টাকা পি কে হালদারের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন। অপরদিকে জেনিথ অ্যান্ড জেফার মূলত কাগুজে প্রতিষ্ঠান, যা ছিল শামসুল আলামিন গ্রুপের এবং এর পক্ষে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ছিলেন ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেম।

গ্রীন রোডের ৬৬ কাঠা জমি ক্রয়ের জন্য অগ্রিম হিসেবে পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেম ২০১০ সালের দিকে পিপলস লিজিং থেকে ১২৩ কোটি টাকা গ্রহণ করেন, যার মধ্যে ৯৮ কোটি টাকা দিয়ে ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেম এবং শামসুল আরেফিন আলামিন তাদের পিপলস লিজিংয়ের ঋণগুলো সমন্বয় করেন। মূলত জমি ক্রয়ে দালালি করে ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেম ১২ কোটি টাকা এবং শামছুল আরেফিন আলামিন ২৫ কোটি টাকা ঘুষ নেন, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট প্রতিবেদনও উল্লেখ রয়েছে।

পি কে হালদারের সহযোগী উজ্জ্বল কুমার নন্দীর জবানবন্দিতে উঠে আসে- ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অডিটের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর, সাবেক জিএম (বর্তমানে নির্বাহী পরিচালক) শাহ আলমসহ অন্যদের এক কোটি টাকা করে সাড়ে ছয় কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। এস কে সুর ও শাহ আলমের ব্যাংক হিসাবও ইতোমধ্যে তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এর আগে ২৫ জানুয়ারি পি কে হালদার কেলেঙ্কারিতে ৩৫০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩৩ জন শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে পৃথক ৫টি মামলা করে দুদক। মামলার অভিযোগে আনান কেমিক্যাল লিমিটেডের নামে- ৭০ কোটি ৮২ লাখ টাকা, সুখাদা প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নামে ৬৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা, মেসার্স বর্ণ-এর নামে ৬৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, রাহমান ক্যামিকেলস লিমিটেডের নামে ৫৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ও মুন এন্টারপ্রাইজের নামে ৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। আসামিরা হলেন- রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার), আনান কেমিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমিতাভ অধিকারী, পরিচালক প্রিতিশ কুমার হালদার, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, পূর্ণিমা রানী হালদার, রাজীব সোম, রতন কুমার বিশ্বাস ও পরিচালক ওমর শরীফ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-এর সাবেক এমডি রাশেদুল হক ছাড়াও ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আনোয়ারুল কবীর, মো. নুরুল আলম, নাসিম আনোয়ার, মো. নুরুজ্জামান, এম এ হাশেম, মোহম্মদ আবুল হাসেম, জহিরুল আলম, পরিচালক নওশেরুল ইসলাম, বাসুদেব ব্যানার্জি ও তার স্ত্রী পাপিয়া ব্যানার্জি, মিজানুর রহমান, একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ভারপ্রাপ্ত এমডি সৈয়দ আবেদ হাসান, ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহিদা রুনাই, অ্যাসিটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আল মামুন সোহাগ, সিনিয়র ম্যানেজার রাফসান রিয়াদ চৌধুরী এবং কোম্পানি সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান।

অন্যদিকে রাহমান ক্যামিক্যাল লিমিটেডের পরিচালক স্বপন কুমার মিস্ত্রি, কাজী মমরেজ মাহমুদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা মর্জিনা বেগম, মেসার্স বর্ন লিমিটেডের মালিক অনঙ্গ মোহন রায় ও মুন এন্টারপ্রাইজের মালিক শংখ বেপারীকেও আসামি করা হয়।

আসামিদের মধ্যে পি কে হালদারের সহযোগী পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের সাবেক এমডি রাশেদুল হককে ২৪ জানুয়ারি সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান গ্রেপ্তার করেন।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সহযোগী হিসেবে ৬২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে পি কে হালদার ওই প্রতিষ্ঠানসহ পিপলস লিজিং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) দায়িত্ব পালন করে প্রায় ৩৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন।

ক্যাসিনো অভিযানের ধারাবাহিকতায় প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক। গেল ৮ জানুয়ারি দুদকের অনুরোধে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার পরোয়ানা দিয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করে ইন্টারপোল। এ কেলেঙ্কারিতে এখন পর্যন্ত ২৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭ জন। যাদের মধ্যে উজ্জ্বল কুমার নন্দী ছাড়াও পিকে হালদারের সহযোগী শংখ বেপারী ও রাশেদুল হক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আরএম/এমএইচএস