উত্তর বাড্ডায় বাসের জন্য অপেক্ষায় যাত্রীরা/ ছবি: ঢাকা পোস্ট

সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে লকডাউন। শনিবার (৩ এপ্রিল) এই বার্তা প্রচারের পর থেকেই রাজধানী থেকে বিভিন্ন জেলায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যাত্রীর চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জেলায় অবস্থানরত ব্যক্তিরা ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। বাড়তি ভাড়া দিয়েই তারা যাত্রা শুরু করছেন। পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, সোমবার ও তারপরের দিনগুলোর জন্য কেনা আগাম টিকিট অনেকে ফেরত দিচ্ছেন।

লকডাউন সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পর জরুরি পণ্যবাহী ছাড়া অন্যান্য যান চলাচল বন্ধ থাকবে। এজন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন, লকডাউনে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করবে না। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সোমবার থেকে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা আবুল কালাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে- এমন আভাস আমরা আগেই পেয়েছি। শনিবার থেকে মহাখালী বাস টার্মিনালে টিকিট প্রত্যাশীর চাপ একটু বাড়তে থাকে। আজ যাত্রীর চাপ বেড়ে যাবে। এখন ৪১ আসনের বাসে ১৫-১৮ জনের বেশি যাত্রী হচ্ছে না। ঢাকা থেকে বগুড়া, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন রুটের বাসে যাত্রীরা আগাম টিকিট কেটেছেন রোববারের যাত্রার জন্য।

রাজধানীর মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলি বাস টার্মিনালে যাত্রী বেড়েছে। শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় বাড়িমুখো মানুষের ভিড় বেড়েছে। ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হানিফ খোকন ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন কমে গেছে। প্রাইভেট কারও কম। অটোরিকশায় দুরপাল্লার যাত্রীরা বিভিন্ন টার্মিনালে যাচ্ছেন। কিন্তু লকডাউনে অটোরিকশা চালকদের বিকল্প কর্মসংস্থান কী হবে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।

ঢাকা থেকে প্রতিদিন শতাধিক যাত্রীবাহী ট্রেন বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। এসব ট্রেনের আগাম টিকিট অনেকেই ফেরত দিচ্ছেন বলে কমলাপুর রেলস্টেশন সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে যাত্রী বেড়েছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাস পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। তাই সিএনজি-অটোরিকশা এমনকি রিকশায় করেও টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে যাচ্ছেন যাত্রীরা।

লকডাউন ঘোষণার আগেই রংপুর শহরে নিজের বাড়িতে যাবেন বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন আবদুল আলীম। কিন্তু লকডাউনের খবরে আগেই যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকায় টিউশনি করে চলি। লকডাউনে এটাও বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বাড়ি চলে যাচ্ছি।

মোটরসাইকেল চালক সাইদুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করছি। সেটাও বন্ধ হয়ে আছে। তাই আজই কিশোরগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে চলে যাব।

নিকেতনে একটি নির্মাণাধীন ভবনে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন রইচ উদ্দিনসহ ছয়জন। ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা বাড্ডায় অপেক্ষা করতে দেখা যায় তাদের। গন্তব্য গাবতলি বাস স্ট্যান্ড, সেখান থেকেই তারা যাবেন নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে।

আলাপকালে নির্মাণ শ্রমিক রইচ উদ্দিন বলেন, নির্মাণাধীন একটি ভবনে কাজ করতাম। কিন্তু কাল (সোমবার) থেকে লকডাউন, তাই কাজ বন্ধ। এই সময় আমরা খাবো কী, করব কী? তাই বাধ্য হয়েই আজ ঢাকা থেকে চলে যাচ্ছি। গাবতলি যাওয়ার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি। কিন্তু সব বাসের গেট বন্ধ, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও বাসে উঠতে পারছি না।

তিনি বলেন, আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেকে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে ঢাকায় কাজ করেন। এদের বেশিরভাগই আজ ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। লকডাউন শেষ হলে আবার আসব। শুধু এই নির্মাণ শ্রমিকরাই নয়, আগামীকাল (সোমবার) থেকে লকডাউনের ঘোষণার পর অনেকেই ঢাকা ছেড়ে নিজ জেলায় চলে যাচ্ছেন। 

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিএনজির চালকের সঙ্গে বাড়ি নিয়ে দরদাম করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি আমি। আমি নিজেও একটু অসুস্থ। যে কারণে লকডাউনের সময় আমাকে হোম অফিসের সুযোগ দিয়েছে অফিস। তাই লকডাউনের সময়ে ঢাকায় না থেকে বাড়ি চলে যাচ্ছি। কল্যাণপুর বাস টার্মিনাল থেকে বগুড়ায় যাব। অনেকক্ষণ ধরে বাসে ওঠার চেষ্টা করছি কিন্তু বাসের গেট লাগানো। আমাদের নিচ্ছে না। যে কারণে সিএনজিতে যেতে দরদাম করছি। তারাও অনেক বেশি ভাড়া চাচ্ছে।

শনিবার দুপুরে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে জানান, করোনা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হওয়ায় আগামী সোমবার (৫ এপ্রিল) থেকে এক সপ্তাহের জন্য সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে। তবে শিল্প-কলকারখানা শর্তসাপেক্ষ চালু থাকতে পারে। বন্ধ থাকবে দোকানপাট-বিপণি বিতান।

আজও অফিসগামী মানুষের ভোগান্তি
করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকারের দেওয়া ১৮টি জরুরি নির্দেশনায় গণপরিবহনে ৫০ শতাংশ সিট ফাঁকা রাখার কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে গণপরিবহনের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী বাসে ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে চলাচল করায় আগে থেকেই পরিপূর্ণ হয়ে গেট বন্ধ করে আসছে বাসগুলো। ফলে আজও ভোগান্তি পড়েছেন মাঝপথে অপেক্ষমান যাত্রীরা। তারা বাসে উঠতে পারছেন না বলে অভিযোগ জানিয়েছেন।

রাজধানীর রামপুরা থেকে কাকরাইল যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী ফরিদুর রহমান। তিনি বলেন, বাসে শুধু ভাড়া বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই কার্যকর হয়নি। তার সঙ্গে যাত্রীদের হয়রানি শুধু যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারছি না। সব বাস ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে গেট বন্ধ করে আসছে। যে কারণে এই মধ্যপথ থেকে শত চেষ্টা করেও বাসে উঠতে পারছি না।

৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করে বাসের জন্য অপেক্ষমান আরেক যাত্রী তাজবিদুল ইসলাম বলেন, বাসে যেসব স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা সেগুলোর কিছুই মানা হচ্ছে না। ৫০ শতাংশ যাত্রী পরিবহনের নামে শুধু আমাদের কাছ থেকে বেশি ভাড়াই আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু অর্ধেক যাত্রীর চেয়ে বেশি যাত্রী ঠিকই পরিবহন করছে তারা। এমন নির্দেশনা শুধু সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিই বাড়িয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

পিএসডি/এএসএস/এসএসএইচ