চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও পূর্ণাঙ্গ অঙ্গীকার ছাড়া কোনো নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মন্তব্য করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ও ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।

শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে নাগরিক সংগঠন ‘সুজন–সুশাসনের জন্য নাগরিক’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় কেমন ইশতেহার চাই?’ মূল প্রবন্ধে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, চব্বিশের জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জাগরণ এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার এক তীব্র বিস্ফোরণ। এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে জনগণ আর নীরব দর্শক থাকতে রাজি নয় এবং তারা অবিচার, বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতার উত্তরাধিকার বহন করতে চায় না। জনগণ চায় অংশগ্রহণমূলক, মর্যাদাভিত্তিক ও ন্যায়সংগত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বড় রাজনৈতিক দলগুলো একাধিক জোট গঠনে উদ্যোগী হলেও এসব জোট আদর্শিক না-কি, কেবল নির্বাচনী সমঝোতা—তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, জনগণ তত বেশি জানতে চায়—নির্বাচনে জয়ী হলে দলগুলো কী করবে, কীভাবে করবে এবং কখন করবে, যার স্পষ্ট প্রতিফলন নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা জরুরি।

জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কার কমিশনসমূহের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ কেবল একটি দলিল নয়; এটি জনগণের নৈতিক প্রত্যাশার প্রতীক এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার পথরেখা। রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোকে এই সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন, সংবিধানে তফসিল হিসেবে সংযুক্তি এবং এর বৈধতা নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন না তোলার বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত যেসব সিদ্ধান্ত রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন ও বিধি-বিধান পরিবর্তনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ইশতেহারে থাকতে হবে। বেছে বেছে গ্রহণযোগ্যতা আর গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহির বিষয়ে ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা নির্ভর করে রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক তার ওপর। অতীতে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে শাসনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় জনগণ সরকারি বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার রোধে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকতে হবে।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে। বিচার বিভাগের চলমান সংস্কারকে স্বাগত জানালেও নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা।

তিনি আরও বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও যাতে জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে, সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রস্তাবিত জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।

সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা ও পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতরেও গণতান্ত্রিক ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছ হতে হবে। দলের নেতৃত্ব সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হওয়া, আর্থিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিচালনা এবং মনোনয়নে তৃণমূলের মতামত প্রতিফলন জরুরি। একইসঙ্গে নির্বাচনী অঙ্গন দুর্বৃত্তমুক্ত করতে হবে।

দুর্নীতিবিরোধী লড়াই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং প্রতীকী নয়, কার্যকর ও টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। যোগ্যতা, পরিশ্রম ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির নিশ্চয়তা দিতে না পারলে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই। এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে যা উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করবে এবং পরিবেশ ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করবে। চরম দারিদ্র্য দূরীকরণকে দয়ার বিষয় নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে।

নারী ক্ষমতায়নের বিষয়ে ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সংসদের সংরক্ষিত আসন সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায় নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয় না। ক্ষমতা ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত না করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় মানতে হবে।

স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার। পাশাপাশি বিশুদ্ধ বায়ু ও নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি ইশতেহারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, নাগরিকরা নিখুঁত নেতৃত্ব চান না; তারা চান সততা, দায়িত্ববোধ ও দিকনির্দেশনা। এই সময়কে সংকট নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের নবযাত্রার সূচনা হিসেবে দেখতে হবে।

এতে আরও উপস্থিত ছিলেন– সুজন সম্পাদক ও সুজন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজনের কোষাধ্যক্ষ ও সুজন ট্রাস্টি বোর্ডের ট্রাস্টি সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য ও নির্বাচন কার্যক্রম সমন্বয়ক একরাম হোসেন এবং সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

এমএইচএন/বিআরইউ