কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেওয়া ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে নিখোঁজ হন বহু মানুষযাদের বেশিরভাগের অজ্ঞাত পরিচয়ে ঠিকানা হয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে

আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ে হারিয়ে যাওয়া স্বজনের খোঁজে ধারে ধারে ঘুরেছেন পরিবারের সদস্যরাজুলাই যোদ্ধাদের নানা কর্মসূচিতে নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে দাঁড়িয়েছেন তারাপ্রিয় মানুষটি জীবিত না থাকলেও শ্রদ্ধাভালোবাসা প্রকাশের জন্য অন্তত কবরটি হলেও দেখার আকুতি জানিয়ে আসছিলেন স্বজনরাঅজ্ঞাত স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

দীর্ঘ এক মাসের চেষ্টায় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা অজ্ঞাত শহীদদের মধ্যেজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছেসোমবার সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহঅন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে স্বজনদের কবর বুঝিয়ে দেওয়া হয়

দীর্ঘ দেড় বছর পর প্রিয় সন্তানের কবরের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়েন উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকারের মা হাজেরা বেগম, যাত্রাবাড়ীতে নিহত সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম, মাহিমের মা জোসনা বেগমস্ত্রী। এ সময় রায়েরবাজার কবরস্থানে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ

যাত্রাবাড়ীর কাজলায় আন্দোলনে গিয়ে নিহত সোহেল রানার মা ছেলের কবরের সামনে গিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননিছেলের নানা স্মৃতি তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েনতিনি বলেন, বাবা তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি নাআমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে গেলিবাবা, আর তোরে পাইলাম না

মা রাশেদাসহশহীদের স্বজনদের আহাজারিতে আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠেদীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের কবর পেয়ে কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ মাটি ছুঁছেন, কেউ কবরে লাগানো গাছে হাত বুলাচ্ছেনসবার চোখের পানিতে ভাসছিল নানা স্মৃতি

সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন

শনাক্ত হওয়া জুলাই যোদ্ধারা হলেন, মাদারটেক এলাকায় নিহত কাবিল হোসেন (৫৮), বাবা : মৃত বুলু মিয়া, মা: ছামেনা বেগম; যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মদবাগ এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৩৮), বাবা : মো. লাল মিয়া, মা: রাশেদা বেগম; উত্তরায় নিহত আসাদুল্লাহ (৩১); বাড্ডায় নিহত পারভেজ ব্যাপারী (২৩), বাবা : সবুজ ব্যাপারী, মা: শামসুন্নাহার; যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত রফিকুল ইসলাম (২৯), বাবা : মৃত খোরশেদ আলম, মা: আলেয়া বেগম; মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিম (৩২), বাবা : গাজী মাহমুদ, মা: জোসনা বেগম; উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকার (২৬), বাবা : শফিকুল ইসলাম, মা: হাজেরা বেগম এবং রফিকুল ইসলাম (৫২), বাবা : মৃত আব্দুল জব্বার শিকদার, মা: জাহানারা বেগম

এদিকে অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তের পর কবর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সিআইডি প্রধান বলেন, জুলাই ১৫ থেকেআগস্ট পর্যন্ত ১১৪টি কবরের মরদেহ উত্তোলনডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে প্রোফাইলিং করা হয়েছেঅজ্ঞাত শহীদদের ৯টি পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা আজজনের পরিচয় শনাক্ত করেছিআর একজন শহীদের নাম জিলানিতার পরিবার সৌদি আরবের মদিনায় বসবাস করেজিলানির জন্মবেড়ে ওঠা মদিনায়জুলাই আন্দোলনে ছুটিতে দেশে এসে তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেনটানা আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনিআগস্ট বনানী এলাকায় মারা যানতার বোনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, কিন্তু ডিএনএ মেলেনিআমরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিএবার জিলানির ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে আমরা চেষ্টা করব

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিএনএ প্রোফাইলিং করার পর যথাযোগ্য মর্যাদায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পুনরায় আমরা তাদের কবরস্থ করেছি

২০২৫ সালেরডিসেম্বর বিশেষ প্রস্তুতি শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্তে লাশ উত্তোলন শুরু করে সিআইডিএই কাজে আর্জেন্টাইন নাগরিকআন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্টফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডার-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় নমুনা সংগ্রহের কাজ চলে

এসএএ/এমএসএ