চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা এলাকায় কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় দুই শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের শরীর থেকে মাথা, হাত ও পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং অন্যজনের শরীরেও হালকা আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে আড়াইটার দিকে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

এদিকে দুর্ঘটনার পর থেকে দুই শ্রমিকের মৃত্যুকে ডাকাতের হামলায় নৌকাডুবির কারণে বলে প্রচার করে কারখানা কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, রাতে বোটে করে ডাকাতির চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে কারখানার শ্রমিকরা আরেকটি বোট দিয়ে ডাকাতদের ধাওয়া করে। কিছুদূর গিয়ে শ্রমিকদের বহনকারী নৌকাটি উল্টে যায়। এতে চারজন পানিতে পড়ে গেলেও দুজন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন এবং অন্য দুজন পানিতে তলিয়ে যায়। সোমবার ভোরে পার্শ্ববর্তী আরেকটি ইয়ার্ড সংলগ্ন তীরে দুই শ্রমিকের মরদেহ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ এবং শিল্প পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

কারখানার কর্মকর্তা জেলা ও শিল্প পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোববার দিবাগত রাতে কারখানাটিতে ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। মূলত জাপান থেকে একটি জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের জন্য রাতে শিপইয়ার্ডে আসার কথা। শিপইয়ার্ড থেকে দুটি বোট জাহাজটিকে এগিয়ে আনতে যায়। এর মধ্যে একটি দিকনির্দেশনার জন্য। অন্যটিতে কিছু প্রয়োজনীয় মালামাল ছিল। বড় জাহাজটি শিপইয়ার্ডে পৌঁছার আগে ঘন কুয়াশার কারণে একটি বোট দেখতে পায়নি। এতে বড় জাহাজের নিচে একটি বোট তলিয়ে গেলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

শিল্প, সীতাকুণ্ডে থানা এবং জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন, তারা প্রাথমিকভাবে শিপইয়ার্ডে কর্মরত ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা নিশ্চিত হয়েছেন, রোববার রাতে কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। গ্রিন তালিকাভুক্ত কারখানাটি দুর্ঘটনাকে আড়াল করতে গিয়ে ডাকাতি বলে প্রচার শুরু করেছে।

কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম উদ্দিন বলেন, সোমবার সকালে একটি জাহাজ ভেড়ানোর সূচি ছিল। এ কারণে শ্রমিকরা ভোর থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় দুটি কালো বোটে করে ডাকাতরা ইয়ার্ডের দিকে আসতে দেখে শ্রমিকেরা তাদের ধাওয়া দেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। ইয়ার্ড থেকে অন্য একটি নৌকা গিয়ে কয়েকজন শ্রমিককে উদ্ধার করা হলেও দুজন পানিতে তলিয়ে যান। পরে কয়েকশ মিটার দূরে একটি ইয়ার্ডের সামনে থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তবে জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, কারখানা মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী ডাকাতের ধাওয়ায় পানিতে তলিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এটি হলে শ্রমিকের দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন কীভাবে হলো। মূলত ডাকাতি বলে প্রচার করে দুর্ঘটনাকে আড়াল করছে মালিকপক্ষ।

জাহাজভাঙা শ্রমিকদের জীবনমান ও দুর্ঘটনার জরিপ নিয়ে কাজ করে থাকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) নামে একটি সংগঠন। এটির সেন্টার কো-অর্ডিনেটর ও জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা যতটুকু জেনেছি রোববার রাতে দুর্ঘটনায় দুই শ্রমিক নিহত হয়েছেন। রিসাইক্লিংয়ের জন্য শিপইয়ার্ডে একটি বড় জাহাজকে এগিয়ে আনতে গিয়ে শ্রমিকরা হতাহত হয়েছেন। কুয়াশার কারণে বড় জাহাজটি থেকে নাবিকরা ছোট বোটকে দেখেনি। এ কারণে একটি বোট বড় জাহাজের নিচে ঢুকে গেলে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘন কুয়াশার বিষয়টি আমলে না নেওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কর্তৃপক্ষের ডাকাতির ঘটনা দাবির বিষয়টি ডাহা মিথ্যা কথা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুই শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। দুজনের মধ্যে একজনের শরীর থেকে মাথা, পা ও হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিহতদের মরদেহ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি।

সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ও শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। সম্প্রতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিলসের একটি জরিপে ওঠে আসে, ২০২৫ সালে জাহাজভাঙা খাতে মোট ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৮ জন শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চারজন, মারাত্মক আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং হালকা আহত হয়েছেন ১৫ জন। চারটি ঘটনায় একাধিক শ্রমিক একসঙ্গে আহত হন। 

জরিপে উঠে আসে দুর্ঘটনার প্রায় ৬৩ শতাংশই ছিল মারাত্মক। এসব ঘটনায় হাত-পা কাটা বা থেতলে যাওয়া, হাড় ভাঙা, মাথা, চোখ, কান ও বুকে গুরুতর আঘাত এবং আগুন ও বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হালকা দুর্ঘটনার হার ২৯ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল মাথায় গুরুতর আঘাত, ভারী লোহার আঘাত এবং ট্যাংকির ভেতরে পড়ে যাওয়া— যার সবকটিই প্রতিরোধযোগ্য বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারী লোহা, লাইনার বা গার্ডার পড়ে আঘাত পাওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে আগুন, গ্যাস ও অক্সিজেন বিস্ফোরণ (২০ শতাংশ)। উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং ম্যাগনেট, ক্রেন বা যন্ত্রপাতিজনিত দুর্ঘটনা উভয়ই প্রায় ১৫ শতাংশ। কাটিং ও গ্রাইন্ডিং দুর্ঘটনা ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য ছোটখাটো দুর্ঘটনা প্রায় ৫ শতাংশ।

এদিকে সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত ও যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম নাজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, কে আর রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে শিপইয়ার্ডে নতুন জাহাজ তোলার (বিচিং) সময় সিগন্যাল দেওয়া একটি নৌকাকে জাহাজটি ধাক্কা দেয়। এতে নৌকাটি জাহাজের নিচে তলিয়ে যায় এবং দুজন শ্রমিকের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। রাতে ঘন কুয়াশায় জাহাজ বিচিং করার কারণে এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইতোমধ্যে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাকে ডাকাতি হিসেবে প্রচার করে মূল বিষয়কে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র করার শুরু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এভাবে মূল বিষয় এড়িয়ে গেলে জাহাজভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভব হবে না। সুতরাং দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করে যথাযথ উদ্যোগ নিলে টেকসই ও নিরাপদ জাহাজভাঙা শিল্প নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এমআর/এসএম