শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের নেতারা বলেছেন, শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন, তারা যেন শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়টি ভুলে না যান।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রম ইস্যুর অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয়ভাবে শ্রম বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শ্রমিক অধিকার জাতীয় অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স’-এর উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। 

এ সময় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে উত্থাপিত ‘শ্রমিক ইশতেহার’ তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক ইশতেহারের মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। এতে বক্তব্য রাখেন অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক ও বিলসের মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় শ্রমিক জোটের সভাপতি মেসবাহউদ্দীন আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনে ১৫ দফা সুপারিশসম্বলিত শ্রমিক ইশতেহার প্রস্তাব করা হয়। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—শ্রম আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে সব শ্রমিকের আইনি স্বীকৃতি, নিবন্ধন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা; শ্রমজীবী মানুষের শোভন ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের অধিকার নিশ্চিত করা; সব শ্রমিকের জন্য ন্যায্য ও জীবন বিকাশের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করা; নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা এবং কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি ও সব দুর্ঘটনার বিচার ও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

এ ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের জন্য রেশন, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবাসহ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা; সংগঠন ও দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা; শিল্পসম্পর্ক চর্চা ও নীতিনির্ধারণে শ্রমিকের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো; অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থা জোরদার করা; কর্মক্ষেত্রে সম-অধিকার নিশ্চিত করে হয়রানি, সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করা এবং নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতনে ছয় মাসে উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়।

ইশতেহারে আরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, শিশু ও কিশোর শ্রম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; শ্রম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অটোমেশন ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ন্যায্য রূপান্তর নিশ্চিত করা; অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ইপিজেড শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং সব বিদেশি বিনিয়োগে শ্রমিক অধিকার ও দক্ষতা উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ; এবং জাতীয় পর্যায়ে শ্রম ক্ষেত্রের সংকট মোকাবিলায় একটি স্থায়ী জাতীয় শ্রম কমিশন গঠন।

নজরুল ইসলাম খান তার বক্তব্যে বলেন, অ্যালায়েন্স এই শ্রমিক ইশতেহার শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে হস্তান্তর করেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মাঠ পর্যায়ে শ্রমিকদের মধ্যে এটি পৌঁছে দেওয়া হবে এবং একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ, লবি ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এর মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও কল্যাণ বিষয়ে জাতীয় বোঝাপড়া ও সচেতনতা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ তার বক্তব্যে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, মজুরি বৈষম্য বিলোপ এবং সব শ্রমিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। 

তিনি বলেন, প্রতিটি আন্দোলনে শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি রক্ত দেন এবং বড় অবদান রাখেন, কিন্তু পরিবর্তনের পর যারা ক্ষমতায় আসেন তারা শ্রমিকদের কথা ভুলে যান। তিনি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান, শ্রমিকদের অবদান স্মরণ রেখে শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি যেন অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল কাদের হাওলাদার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুজ্জামান বাদশা, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি এ আর চৌধুরী রিপন, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব সেকেন্দার আলী মিনা এবং নারীপক্ষের সদস্য রওশন আরা। এ সময় অ্যালায়েন্সভুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে আশা প্রকাশ করা হয়, শ্রমিক ইশতেহারের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে, যেখানে শান্তিপূর্ণ শিল্পসম্পর্ক, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সবার অংশগ্রহণ ও ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নীতিগতভাবে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে আগামীর বাংলাদেশ একটি বৈষম্যহীন, মর্যাদাকর, টেকসই ও সুষম উন্নয়নের দেশে রূপ নেবে এবং বিশ্বপরিসরে ‘প্রতিযোগী বাংলাদেশ’ হিসেবে অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে শ্রমিক ইস্যুকে একটি প্রধান নীতিনির্ধারণী বিষয় হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের ভোটের সংখ্যাকে উপেক্ষা করে জাতীয় পর্যায়ে কোনো পরিকল্পনা বা অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে সর্বজনীন রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রত্যাশা করা হয়।

এএসএস/এসএম