ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতি ও অপহরণ সিন্ডিকেটের মূল হোতা মো. সরোয়ার হোসেন মনুসহ তিনজনকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। মনুর বিরুদ্ধে হত্যাসহ ১০টি মামলা রয়েছে। এই ডাকাত চক্রটি যাত্রী বেশে মাইক্রোবাসে অবস্থান নেয়। এরপর যাত্রী তুলে সবকিছু হাতিয়ে নিয়ে ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কে মাইক্রোবাস থেকে ফেলে দেয়। তারা চট্টগ্রামের বাহির থেকে বিশেষ করে বরিশাল ও বরগুনা থেকে চট্টগ্রামে এসে ডাকাতি করে আবার গন্তব্যে চলে যেত। 

সোমবার ( ১৭ জানুয়ারি) চান্দগাঁও কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ।

তিনি বলেন, ডাকাত চক্রটি মাইক্রোবাস নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকে। এই জন্য মাইক্রোবাসে একেক জন একেক সিটে বসে কেউ তসবি পড়তে থাকে। আবার কেউ ভদ্রভাবে বসে থাকে। সর্বোপরি রাস্তার যাত্রীদের বিশ্বাস করানোর জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করে। ফলে যাত্রীরাও ছদ্মবেশ ধারণ করে গাড়িতে বসে থাকা ডাকাতদের যাত্রী মনে করে কম টাকায় গন্তব্যে পৌছার জন্য ডাকাতদের গাড়িতে উঠে। গাড়িতে উঠার পর ডাকাতরা বিভিন্ন ধর্মীয় কথাবার্তা বলতে থাকে। কিছু দূর যাওয়ার পর ডাকাত দলের একজন নামার কথা বলে টার্গেট যাত্রীকে মাঝখানের সিটে বসায়। তারপর শুরু হয় যাত্রীবেশে থাকা ডাকাতদের আসল রূপ।

তিনি বলেন, গ্রেফতার আসামিরা যাত্রীদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, জিম্মি করে মারপিট করে, গলায় গামছা পেঁচিয়ে পিছনে টান দিয়ে ভয়নাক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এরপর যাত্রীদের নিকট থেকে নগদ টাকা পয়সা, মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। পরে যাত্রীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে তা হাতিয়ে নিত। পরে তাদের কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার মধ্যবর্তী সুবিধা জনক স্থানে যাত্রীকে ফেলে দিয়ে চলে যেতো তারা। এছাড়াও যাত্রীদের রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়ার আগে ভিকটিমের চোখে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক মলম লাগিয়ে দিত। ফলে ভিকটিমকে গাড়ি থেকে ফেলে দিলেও তখন গাড়ির নম্বর দেখতে পেত না। 

র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক বলেন, সোমবার ভোররাতে ডাকাতির প্রস্তুতি কালে পাহাড়তলি থানার উত্তর কাট্টলী খেজুরতলী জাইল্যাপাড়া ব্রিজের নিকট থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি দুনলা বন্দুক, দুইটি এলজি ও ৪ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতার তিনজন হলেন- বরিশালের কাউনিয়া উপজেলার মো. সরোয়ার হোসেন মনু (৩৪), বরগুনার তালতলী উপজেলার মো. রিপন (৩২) ও একই উপজেলার তাসলিমা বেগম (৩৬)।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার রিপন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, কিছুদিন আগে মনু ডাকাতের সঙ্গে থেকে রিপন যাত্রীদের মাইক্রোবাসে উঠিয়ে একই পদ্ধতি অবলম্বন করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়েছে। এরপর ভিকটিম  যাত্রীকে রাস্তার পাশে ফেলে চলে যায়। তাছাড়া তাসলিমার স্বামী মিজানুর রহমান চান মিয়া ডাকাতদেরকে মাইক্রোবাস সরবরাহ করে। এছাড়া তাদের সঙ্গে ডাকাতির কাজ করে থাকে। তার জন্য সে টাকার আলাদা ভাগ পায়। আর তাসলিমা স্বামীর কাজে সহযোগিতা করার জন্য ডাকাতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এছাড়া প্রয়োজনে সেও ডাকাতির কাজে অংশগ্রহণ করত বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ বলেন, গত ১৯ ডিসেম্বর দুবাই প্রবাসী হোসেন মাস্টারকে যাত্রী সেজে গাড়িতে তুলে সবকিছু নিয়ে নির্যাতন করে কুমিল্লায় গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। এরপরের দিন তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ১ জানুয়ারি পাহাড়তলি থানায় হত্যা মামলা করা হয়। সেই মামলার প্রধান আসামি মো. সরোয়ার হোসেন মনু। মনু তার সহযোগীদের নিয়ে অপরাধটি সংঘটিত করেছিল বলে র‌্যাবের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটিও জব্দ করা  হয়েছে।

উল্লেখ, হোসেন মাস্টার হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে ১৩ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাত চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। এর মধ্যে চার ডাকাত হোসেন হত্যায় জড়িত ছিল। তারা ডাকাতির ঘটনায় মূল হোতা হিসেবে মনুর নাম বলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। 

কেএম/আইএসএইচ