ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ওই দিনে সবাই সাদা কালো পোশাক পরে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়ার প্রচলন বহু যুগের। তখন শুধু সাদাতে  কালো পাড়ের শাড়ি, পুরুষরা সাদা পাঞ্জাবি পাজামা কালো ফিতা দিয়ে ব্যাজ পরে, বর্ণমালার বা প্রতিবাদের ফেস্টুন আর ফুল নিয়ে খালি পায়ে শ্রদ্ধা জানাতে যেতো যা আমরা ছোট্ট বেলায় দেখেছি। বাংলাদেশে বুটিকের কাপড় পরার প্রচলন ছিলো শুধু ঈদকে কেন্দ্র করেই। বিশেষ কোন ডিজাইন এর পোশাক পড়ে এই দিবস পালিত হতো না। সাদা কালো পাড়ের শাড়ি, ঘর থেকে বয়স্করা নিয়ে প্রভাতফেরিতে যাওয়া এতটুকুই ছিল তখনকার পোশাক আর আনুষ্ঠানিকতা একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে।

ধীরে ধীরে আশির দশকে সেই পোশাকে স্থান পেল বর্ণমালার। কবে কখন কে এর উদ্ভাবক তার সঠিক কোনো তথ্য জানা নেই আমার। বর্ণমালা বড়দের  পোশাক থেকে শুরু করে শিশুদের পোশাকেও আসতে শুরু করে। কারণ ওই সময়টা থেকে স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে আরও বিভিন্ন জায়গায় প্রতীকী শহীদ মিনার বানিয়ে প্রভাতফেরি এবং অনেক অনুষ্ঠানের ছোট ছোট আয়োজন হতে শুরু করে। আর পোশাকের চাহিদাও বাড়তে থাকে একুশে ফেরুয়ারিকে কেন্দ্র করে। এরপর আবার বর্ণমালা থেকে নতুন ধারায় স্থান পেলো ফেস্টুনের সেই একুশে নিয়ে লেখা পঙ্‌ক্তিমালা, কবিতা, গানের লাইন নিয়ে লেখাগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্ন পোশাকে।

আমরা এবং এই প্রজন্মের ডিজাইনাররা যখন ডিজাইন করি তখন অবশ্যই আমরা এটা নিয়ে গবেষণা করি। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের আগে, সেই সময় এবং পরের ঘটনার ইতিহাস জানতে হয় আমাদের। সেখান থেকে প্রতিবাদী এবং শোকের ভাষা আর ছবি থেকেই কল্পনায় উদ্ভাবিত হয় বিভিন্ন মোটিফ।

বাংলাদেশে তখন গুটিকয়েক বুটিক হাউজের ডিজাইনাররা ও পোশাকের নতুনত্ব আনতে সাদা কালো রঙকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাভাষা আর বর্ণমালার মিশেলে নিজস্ব আঙ্গিকে পোশাক ডিজাইন করতে শুরু করে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী। দিনে দিনে শুধু শহীদ মিনারে যাওয়াই নয়, আরও অনেক সভা সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শহর ছেড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, স্কুল, কলেজে। আর তার সাথে যথাযথ পোশাকের চাহিদাও বাড়তে শুরু করলো। এর মাধ্যমে আন্দোলনের ভাষার ও আরও বহিঃপ্রকাশ ঘটলো এই পোশাক এর মাধ্যমে।

ফ্যাশন হাউজ এবং ডিজাইনাররাও এটাকে অনেক গুরুত্ব সহকারে নিজেদের ভাবনায় আনতে শুরু করে। আর যখন আমরা এবং এই প্রজন্মের ডিজাইনাররা যখন ডিজাইন করি তখন অবশ্যই আমরা এটা নিয়ে গবেষণা করি। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের আগে, সেই সময় এবং পরের ঘটনার ইতিহাস জানতে হয় আমাদের। সেখান থেকে প্রতিবাদী এবং শোকের ভাষা আর ছবি থেকেই কল্পনায় উদ্ভাবিত হয় বিভিন্ন মোটিফ।

মোটিফ এবং বাংলা শব্দগুলোকে একজন ডিজাইনার সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করে পোশাকে। এভাবেই নিজের জানা থেকে নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যায় ভাষা আন্দোলনের বার্তাগুলো। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিই নয়, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ, নিয়ে কাজ করে এই প্রজন্মকে জানিয়ে দিচ্ছে তার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে।

একুশে ফেব্রুয়ারি ছাড়াও উৎসবভিত্তিক পোশাক, পোশাকের চাহিদা এখন দেশ ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও অনেক বেড়েছে। তাই দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বাজারটা অনেক বড় হচ্ছে দিনে দিনে।

বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অবশ্যই এই কৃতিত্বের অংশীদার। এটা শুধু ব্যাবসায়িক ভাবনা থেকে নয় আমাদের দেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যেকে দেশ এবং দেশের বাইরে পরিচিত করার স্বার্থেও কাজ করে যাচ্ছে আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি।

দেশীয় পোশাক ইন্ডাস্ট্রির বাজারটা এখন অনেক বড় হয়েছে। কারণ বাঙালিরা অনেক উৎসবপ্রেমী,  বারো মাসে তের পার্বণের দেশ। আর উৎসব মানেই পোশাক। যদিও একুশে ফেরুয়ারিকে উৎসবের দিন বলতে পারিনা আমরা। কিন্তু অনেক আনুষ্ঠানিকতা থাকে বলেই পোশাকের একটা চাহিদা থেকেই যায়। আর এই একুশে ফেব্রুয়ারি ছাড়াও উৎসবভিত্তিক পোশাক, পোশাকের চাহিদা এখন দেশ ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও অনেক বেড়েছে। তাই এই দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বাজারটা অনেক বড় হচ্ছে দিনে দিনে।

বাংলাদেশে এখন প্রায় ৫০ হাজার দেশীয় পোশাকের বুটিক রয়েছে এবং প্রায় ৭০ লক্ষ লোক যুক্ত আছে বিভিন্ন ভাবে। ২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে প্রতি বছর এই দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে। সফলতার সাথে তিন দশক ধরে আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বিদেশি পোশাকের আমদানিতে আমাদের সরকার যদি আরও কঠিন নিয়ম নীতিমালা প্রয়োগ করেন, যথাযথ কর আদায়ের মাধ্যমে এবং দেশীয় পোশাক নীতিমালায় শিথিলতা প্রয়োগ করলে দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি আরও সফলতা পাবে।

লিপি খন্দকার ।। স্বত্ত্বাধিকারী, বিবিআনা

lipikhandker@yahoo.com