লেখাটা শুরু করা যাক একটা পুরনো কথা বলে। কথাটা হ’লো; টিভিতে আগে সপ্তাহে একদিনে একটি নাটক দেখতাম। আর নতুন কথা যা তা হ’লো এখন সপ্তাহে একশ’টা নাটক দেখি। ধারাবাহিক বা একঘণ্টার বা টেলিফিল্ম নামে পরিচিত এইসব নাটক প্রতিদিনই হচ্ছে। টিভি নাটকের এ এক স্বর্ণযুগ বলা চলে। এত এত নাটক আর কবে আমাদের টিভিতে হয়েছে। স্বর্ণযুগ বলাতে হয়তো ইতিমধ্যেই কেউ কেউ মুচকি হাসছেন। কেন হাসছেন তার ব্যাখ্যাটা আমি আপনার কাছে না চেয়ে নিজেই দেওয়ার চেষ্টা করি। একটা নাটক আর একশ’টা নাটক তেমন কোনও পার্থক্য তৈরি করে না। কারণ শিল্প পরিমাণে বিচার্য নয় শিল্প মানে বিচার্য হয়। নাটক একটা শিল্প-মাধ্যম। মঞ্চে টিভিতে রেডিওতে নাটক হয়।

সিনেমাতে নাটক শব্দটা চিত্রনাট্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়। চিত্রনাট্য ও নাটক অবশ্য একই অভিধা নয়। কিছুটা পার্থক্যতো আছেই। মঞ্চে যেমন নাট্যকার নাটক রচনা করেন যাকে আমরা পাণ্ডুলিপি বলি, সেই পাণ্ডুলিপি একজন নির্দেশকের হাতে যায়। তিনি পাণ্ডুলিপি থেকে তা নাট্যে রূপ দেন। থিয়েটারও বলা হয় তাকে। অভিনয়, আলো, মঞ্চ, পোশাক, রূপসজ্জা সবকিছু মিলিয়ে পাণ্ডুলিপি মঞ্চে স্থাপিত হয়। ফিল্মের ক্ষেত্রেও তাই। রচয়িতা স্ক্রিপ্টটা লিখে দেন আর পরিচালক সেটাকে ফিল্মে পরিণত করেন। ফিল্মে পরিণত করার জন্যে বা স্যুটিং সম্পন্ন করার জন্যে যে কারিগরি নির্দেশনা আর খুঁটিনাটি বিষয় স্ক্রিপ্টে সংযোজিত হয় সেটাই চিত্রনাট্য।

আসলে দর্শককে খাওয়ানোর ধারণাটাইতো ভুল। কারণ এরকম প্রবণতা নিজের কিছু সৃষ্টি করতে দেয়না। ঢালাও কিছু করা হয়। নাটকগুলো প্রচার করেন যারা বা প্রোডিউস করেন যারা তাদের কথা বলি। তারা কি জানেন না যে, দর্শক তাদের নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

টিভি নাটকের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্নভাবে ঘটে যেখানে নাট্যকার যে পাণ্ডুলিপি দেন সেটা থেকেই সরাসরি স্যুটিং করা হয়। টিভি নাটকের চিত্রনাট্যকারও নাট্যকার নিজেই। সে কারণে সাধারণত টিভি নাটকে রচনা শব্দটা ব্যবহার করা হয়। সিনেমাতে বলা হয় চিত্রনাট্যকার। আর যিনি নাটকটি বানান তাকে বলা হয় নির্দেশক। সিনেমাতে যাকে বলা হয় পরিচালক। সিনেমাতে যারা প্রধান ভূমিকায় থাকে তাদেরকে নায়ক বা নায়িকা বলা হয় কিন্তু টিভিতে তারা অভিনেতা অভিনেত্রী নামে পরিচিতি। টিভি নাটক যে একটা স্বতন্ত্র শিল্পমাধম তা পরিষ্কার করার জন্যে এটুকু লিখলাম। নির্দেশকের নাম ও রচয়িতার নাম। আলাদা করে চিত্রনাট্যকার বলা হয় না। কথাগুলো বলার কারণ এই যে টিভি নাটকে একটা গল্পকে নাটকে রূপ দেওয়া ও তা ক্যামেরার ভিতর দিয়ে টিভি নাটক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নাট্যকার একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ না বলে প্রধান ভূমিকা বলাটাও হয়তো সমীচীন হবে। এখন অবস্থা যদি এইরকম ধরে নেওয়া হয় তবে একটা ভালো টিভি নাটকের সিংহভাগ কৃতিত্ব যেমন নাট্যকারের ঘরে যায় তেমনি ব্যর্থতারও প্রায় সবটুকুই তার। আজকাল নাটক অধিক হারে নির্মাণ ও প্রচার হচ্ছে সেটা আগেই বলেছি কিন্তু সে নাটকগুলো দর্শকপ্রিয়তা পেতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে দর্শকরাই অভিযোগ করছেন। তাদের অভিযোগ অমূলক বলে এড়িয়ে গেলে কোনও কথা বলার প্রয়োজন পড়বে না কিন্তু একেবারেই যে অমূলক তা তো জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।

দর্শক বাংলাদেশের টিভি নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আমাদের নাটক সম্পর্কে নানা অভিযোগও করছেন। আমরাও দেখতে পাচ্ছি আগে যেমন একটা সিনেমার নাম ‘বাবা কেন চাকর’ হ’লে পরপর তিন চারটা সিনেমার নাম হতো ‘অমুক কেন তমুক’ জাতীয়। এখন টিভি নাটকে সে রকমটাই দেখা যাচ্ছে। নাটকের প্রধান চরিত্রের নামের সাথে একটা বিশেষণ জুড়ে দিয়ে নাটকের নাম। কোনও শিল্পচর্চায় যদি এরকম একই ধরণের নামের প্রবণতা দেখা যায় তবে বুঝতে হবে তা শিল্প বিচারে নয় বাণিজ্যিক বিচারে করা হচ্ছে বা দর্শককে খাওয়ানোর জন্যে করা হচ্ছে। যেহেতু একটি খেয়েছে সেহেতু একই রকম আরও অনেকগুলো খাওয়াও।

আসলে দর্শককে খাওয়ানোর ধারণাটাইতো ভুল। কারণ এরকম প্রবণতা নিজের কিছু সৃষ্টি করতে দেয়না। ঢালাও কিছু করা হয়। নাটকগুলো প্রচার করেন যারা বা প্রোডিউস করেন যারা তাদের কথা বলি। তারা কি জানেন না যে, দর্শক তাদের নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। দর্শকের অভিযোগগুলো কি তারা জানেন না, শোনেন না? নিশ্চয় জানেন, নিশ্চয় শোনেন। তবু কেন তারা এরকম নাটক প্রযোজনা এবং প্রচার থেকে বিরত হচ্ছেন না। কেন তারা এগিয়ে আসছেন না আমাদের নাটকের সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজার জন্যে? কারণ টিভি নাটকের মান নির্ধারণ এবং প্রচার ব্যবস্থাপনা সবই তাদের হাতে। একটা সম্মিলিত উদ্যোগের আয়োজন কেন তারা করছেন না? নাটক নির্মাণে সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজেট।

আমাদের চ্যানেলগুলোকে মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। চ্যানেলের পাশাপাশি এসেছে ইউটিউব এবং ওটিটি প্লাটফর্ম। এগুলোতে বেশ বড় বাজেটে মানসম্পন্ন নাটক তৈরী হচ্ছে। ফলে চ্যানেল বিমুখতা আরো বাড়তে পারে।

বাজেট আগের তুলনায় এতই কমে গেছে যে মানসম্পন্ন নাটক নির্মাণ অসম্ভব। এরপর রয়েছে শিল্পী সম্মানী। শিল্পী সম্মানীর ক্ষেত্রে এতটাই বৈষম্য বিরাজ করছে যে তা নাটককে ভীষণভাবে ব্যাহত করছে। আরও একটা উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলও চ্যানেল ও স্পন্সরিং এজেন্সিগুলোর ভিতরে এক ধরণের সখ্যতা যা নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বা কোন ডিরেক্টর বা রাইটার বা অভিনয় শিল্পী নাটকটার সাথে যুক্ত হবেন তা নির্ধারণ করেন তারাই। এবং এখানে একটা প্রচেষ্টা থাকে কত কম খরচে নাটকটা নির্মাণ করে কত বেশি মুনাফা বের করা যায়। ফলে যারা কাজ পাচ্ছেন তারা হয়তো তেমন মানের শিল্পী বা কলাকুশলী নন। তারপরেও কিছু কিছু মানসম্পন্ন নাটক তৈরি হচ্ছে সেটা অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ দিনে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নাটকগুলি নির্মাণ ও প্রচার হচ্ছে তবে তার পরিমাণ খুবই কম।

আমাদের চ্যানেলগুলোকে মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। চ্যানেলের পাশাপাশি এসেছে ইউটিউব এবং ওটিটি প্লাটফর্ম। এগুলোতে বেশ বড় বাজেটে মানসম্পন্ন নাটক তৈরি হচ্ছে। ফলে চ্যানেল বিমুখতা আরও বাড়তে পারে। তাই লেখার শেষে আরও একবার টিভি নাটক সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ আপনারা টিভি নাটকের বিষয়ে নজর দিন। স্বতন্ত্র এই শিল্পমাধ্যমকে শিল্প হিসাবে ঘোষণা করুন।

মাসুম রেজা ।। নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, নাট্য নির্দেশক

masumreza63@yahoo.com