ছবি : সংগৃহীত

একশ্রেণীর ভিডিও নির্মাতা আজকাল ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও আপলোড করে এবং ভিউ বাড়িয়ে অর্থ উপার্জন ও স্বস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার ধান্ধায় মেতে উঠেছে। তারা তথাকথিত প্রাঙ্ক বা ফান কিংবা সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্টের নামে গোপন ক্যামেরার সাহায্যে বিভিন্ন মানুষের ভিডিও ধারণ করে, পরে সেগুলো ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে আপলোড দেয়।

এ ক্ষেত্রে মানুষকে বোকা বানানোর জন্য তাদের সঙ্গে এমন সব নোংরা আচরণ ও কাজ করা হয়, যা ভুক্তভোগীর মান-সম্মানের হানি করে। তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।

বিশেষত কিছু উঠতি বয়সের বিকৃত রুচির তরুণ-তরুণীর এসব আচরণ বর্তমানে বিরাট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমাদের প্রাঙ্ক ভিডিও সম্পর্কে ভালো করে জেনে রাখা উচিত। 

প্রাঙ্ক ভিডিওগুলোতে কী থাকে এবং ইসলামের দৃষ্টিতে তার বিধান কী?

কথিত প্রাঙ্ক ভিডিওগুলোতে সাধারণত যেসব কন্টেন্ট থাকে, সে আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে— এটি হারাম ও গুনাহের কাজ। শুধু তাই নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেমন-

এক.
এতে টার্গেট ভুক্তভোগী ব্যক্তির সঙ্গে ইউটিউবার নানা ধরনের মিথ্যা কথা বলে— তাকে বোকা বানায়। বরং মিথ্যা ও প্রতারণামূলক কথাবার্তা ছাড়া প্রাঙ্ক ভিডিও তৈরি হয় না বললেই চলে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে হাসি-মজাকের ছলেও মিথ্যা কথা বলা হারাম।

বাহজ ইবনে হাকিম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তার দাদা বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘সে ব্যক্তির জন্য ধ্বংস নিশ্চিত, যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৫; আত-তারগীব ওয়াত তারহিব, হাদিস : ৪২০৯; মিশকাত, হাদিস : ৪৮৩৪)

আল্লাহর রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি হাসি-মজাকের ছলেও মিথ্যা বলে না, আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার হবো।’ (সুনানে আবু দাউদ, ৩৬/৮)

প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি করা হারাম

আল্লাহ রাসুল (সা.) হাদিসে বলেছেন, ‘যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ অর্থাৎ সে ইসলামের আদর্শ থেকে বিচ্যুত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১)

দুই.
এসব ভিডিও এর নামে মানুষকে নানাভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত করা হয়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষকে ভীত-ত্রস্ত করা হারাম। যেমন- কখনো মুখোশ পরিধান করে, কখনো পুলিশ বা ডাকাত সেজে, কখনো নকল সাপ বা হিংস্র প্রাণী ইত্যাদি দ্বারা ভুক্তভোগীকে আতঙ্কিত করা হয়।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনও মুসলিমকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।’ (সহিহুল জামে-লিল আলবানি, হাদিস : ৭৬৫৮)

এরা অনেক সময় কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নিরীহ প্রাণীকেও নানাভাবে আতঙ্কিত করে। ইসলামে এটিও জায়েজ নেই।

তিন.
এসব ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (privacy) ভঙ্গ করা হয় বা ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকে হরণ করা হয়। অথচ তা শুধু ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম নয় বরং দেশীয় বা আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধের শামিল। (এ সংক্রান্ত আইন ও শান্তি দেখুন পোস্টের শেষে)

চার. অনেক সময় ভুক্তভোগীর সামনে বিভিন্ন অশ্লীল অঙ্গ-ভঙ্গি করা হয় এবং তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করা হয়, যার ফলে মানুষকে মারাত্মক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

পাঁচ.
সমাজে অশ্লীলতাকে উস্কে দেয়া হয়। যেমন- হঠাৎ কোনও তরুণীকে চুমু খাওয়া, কোনও নারীকে জড়িয়ে ধরা, হঠাৎ কাউকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া, নারীর শরীরে মেসেজ করা ইত্যাদি।

ছয়.
সমাজে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ বিরোধী কার্যক্রমের প্রসার ঘটে।

সাত.
এসব ভিডিওতে বেপর্দা নারী প্রদর্শনী করা হয়। বরং নারীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ভিডিওর প্রধান উপজীব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।’ (সুরা নুর, আয়াত : ১৯)

আট.
প্রাঙ্ক ভিডিওগুলোতে সাধারণত মিউজিক বা বিভিন্ন গানের রিমিক্স যুক্ত করা হয়ে থাকে। এসব নামধারী মুসলিম ভিডিও ক্রিয়েটররা এবং তাদের শ্রোতারা যেন গান-বাজনাকে হালাল মনে করে নিয়েছে। অথচ ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ভূমিধ্বস, চেহারা বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণস্বরূপ আজাব এ উম্মতের মাঝে ঘনিয়ে আসবে। তখন একজন প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কখন এসব আজাব সংঘটিত হবে? তিনি বললেন, যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র বিস্তৃতি পাবে এবং মদ্যপানের সয়লাব শুরু হবে।’ (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ১৬০৪)

নয়.
মজার ছলে এ ক্ষেত্রে মানুষের মান-সম্মান নিয়ে টানা-হেঁচড়া করা বা তাদের নানাভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হেনস্তা করা হয়। এতে বিশেষভাবে নারীরা বিভিন্নভবে ‘ইভ টিজিং’র শিকার হয়। অথচ রাসুল  (সা.)  বলেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং হেয় করবে না।’  তিনি আরও বলেন, ‘একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় করে। এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের রক্ত ঝরানো, ধন-সম্পদ হরণ করা এবং মান-সম্মান ভূলুণ্ঠিত করা হারাম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭)

দশ.
প্রাঙ্ক ভিডিও করতে গিয়ে অনেক সময় নানা দুর্ঘটনা ঘটে। যেমন- দৌড়াতে গিয়ে আঘাত প্রাপ্ত বা রক্তাক্ত হওয়া, ভয়ে-আতঙ্কে হার্ট এ্যাটাক করা, রোগ বৃদ্ধি পাওয়া, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদি।

এগার.
মানুষের মনোযোগ ব্যাঘাত ঘটানো বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে সময় নষ্ট করা। কারণ প্রাঙ্ক ভিডিওর নামে এসব তথাকথিত ইউটিউবাররা যে কোনও সময় যে কারও সঙ্গে তাদের শয়তানি কার্যক্রম শুরু করতে পারে। এতে ব্যক্তি কোনও বিষয়ে নিমগ্ন থাকলে তার মনোযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে বা দরকারি কাজে সময় নষ্ট করে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও উবাদাহ ইবনুস সামিত রা. থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিজের বা অন্যের ক্ষতি করতে পারবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৬৯-২৩৭০)

বারো. এসব ভিডিও ইউটিউবে আপলোড দিয়ে অর্থ উপার্জন করাও হারাম। কারণ এতে অনেক ধরনের হারাম ও অশ্লীল বস্তুর অ্যাড প্রদর্শন এবং গান-বাজনা, মিউজিক ও বেপর্দার নারীর দৃশ্য দেখানো হয়ে থাকে। সুতরাং এসব কারণে তথাকথিত প্রাঙ্ক ভিডিও তৈরি ও প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।

মনে রাখতে হবে, যত মানুষ ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে এসব ভিডিও দেখে গুনাহগার হবে, তত পরিমাণ মানুষের সমপরিমাণ গুনাহের ভাগীদার হবে— যারা এসব ধারণ করেছে, ইডিট করেছে, ইন্টারনেটে আপলোড করেছে বা নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।

প্রাঙ্ক ভিডিও বিষয়ে আইনগত শাস্তি

প্রাঙ্ক ভিডিও বা স্থিরচিত্র ব্যক্তির জন্য মানহানিকর দণ্ডবিধির (১৮৬০) ধারা ৪৯৯, ৫০০ অনুযায়ী। দণ্ডবিধির ধারা ৫০০ অনুযায়ী প্রাঙ্ক ভিডিও বা স্থিরচিত্র ধারণকারীর ২ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ২৮ এবং ২৯ অনুযায়ী প্রাঙ্ক ভিডিও ধারণ অপরাধ, কেননা এটি ব্যক্তির জন্য মানহানিকর। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ভিডিও ধারণকারীর ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। [Source: lawyersclubbangladesh]

উপরোক্ত কারণগুলোর আলোকে প্রাঙ্ক ভিডিও ধারণ করা, আপলোড করা এবং বিনোদনের জন্য সেগুলো দেখা সবই হারাম।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য, এসব তথাকথিত ‘প্রাঙ্ক ভিডিও’র বিরুদ্ধে গণজনসচেতনতা বৃদ্ধি করা আর প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলরা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তব্য হল, এসব অর্থলোভী ও বিকৃত রুচির যুবক-যুবতিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহন ও তার যথার্থ বাস্তবায়ন করা।