আইসিসি কী প্রস্তাব দিতে পারে, বিসিবির প্রতিক্রিয়াই বা কী হবে?

ভারতেরই নতুন দুটি ভেন্যুতে বাংলাদেশকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলার প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। এমন খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফিকশ্চার অনুযায়ী, কলকাতা আর মুম্বাইয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ম্যাচ হওয়ার কথা থাকলেও আইসিসি চেন্নাই আর থিরুভানান্তপুরামকে বাংলাদেশের ম্যাচের নতুন ভেন্যু হিসেবে প্রস্তাবনা দিতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে দাবি করা হচ্ছে।
তবে ভারতের অন্য ভেন্যুতে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হলে বাংলাদেশ খেলতে সম্মতি জানাবে কি না, গত ১০ই জানুয়ারি সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে সেই প্রশ্ন করা হলে জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'ভারতের অন্য ভেন্যু তো ভারতেই।'
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ম্যাচ ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করার দাবি জানিয়ে বিসিবি আইসিসিকে যে চিঠি পাঠিয়েছিল, আইসিসির পক্ষ থেকে আজ বা কাল সেটির উত্তর দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন বুলবুল। অবশ্য আইসিসি যদি শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজন করতে অস্বীকৃতি জানায়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত কী হবে, সংবাদ সম্মেলনে সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি বিসিবি সভাপতি।
"এই বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না, চিঠিটা (আইসিসি'র) না আসা পর্যন্ত"-জানিয়েছিলেন বুলবুল। অর্থাৎ বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপের ম্যাচ না খেলার বিষয়ে তাদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা বললেও এ বিষয়ে আইসিসির প্রতিক্রিয়া জানার পরই বিসিবি তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

ভারতের ভেতরে ভিন্ন ভেন্যুতে খেলা আয়োজনের প্রস্তাবের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও আইসিসির চিঠিতে উল্লেখ করা হতে পারে। খবরে বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশি আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা সৈকতের উদাহরণ টানা হতে পারে। গতকাল (রোববার) ভারতের বরোদায় নিউজিল্যান্ড-ভারত ওয়ানডে ম্যাচে আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সৈকত। খবরে উঠে এসেছে যে সৈকত যেহেতু নিরাপদে ভারতে আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সেই উদাহরণ টেনে আইসিসি বিসিবিকে অনুরোধ করবে যেন বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যেতে সম্মত হয়। আসন্ন বিশ্বকাপে বাংলাদেশি শরফুদ্দৌলা সৈকত ও গাজী সোহেলের ম্যাচ অফিসিয়াল হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ আশা করছে যেন ভারতের সরকারি পর্যায় থেকে বাংলাদেশের সরকারের সাথে 'নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগ' নিয়ে আলোচনা করা হয়। যদিও শনিবার যখন বিসিবি সভাপতিকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে কোনো আলোচনার সুযোগ আছে কি না, তখন বুলবুল বলেন যে, "আমি এ ব্যাপারে কিছু শুনিনি।" তবে বিসিবি চিঠি পাঠানোর পর আইসিসির পক্ষ থেকে বিসিবির নিরাপত্তা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানান বুলবুল।
ক্রিকেটের ইতিহাসে এর আগে বেশ কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছে, যখন কোনো দেশ নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নির্দিষ্ট কোনো একটি দেশে বিশ্বকাপ বা আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মত আসরে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে শ্রীলঙ্কায় যায়নি। সেসময় শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ চলছিলো এবং আসর শুরুর সপ্তাহ দুয়েক আগে কলম্বোতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এরপর ২০০৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়েতে খেলতে যায়নি ইংল্যান্ড। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সেসময় জিম্বাবুয়ের নেতা রবার্ট মুগাবের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। একই বিশ্বকাপে আরেক আয়োজক দেশ কেনিয়ার নাইরোবিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে খেলতে যায়নি নিউজিল্যান্ড। ঐ ম্যাচের কয়েকমাস আগে মোম্বাসায় বোমা বিস্ফোরনের ঘটনা ঘটেছিল।

ছয় বছর পর, ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে। সেসময়ও কারণ ছিল জিম্বাবুয়ে আর যুক্তরাজ্যের মধ্যেকার বৈরি সম্পর্ক। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া সেসময় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ সফর করেনি। সবশেষ ২০২৫ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ম্যাচ খেলতে পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড কারণ হিসেবে জানায় যে ভারতের সরকার পাকিস্তানে দল পাঠাতে অনুমতি দেয়নি।
সেসময় দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড আর আইসিসি কয়েক দফা আলোচনার পর সিদ্ধান্তে আসে যে ২০২৪ থেকে ২০২৭ এর মধ্যে ভারত বা পাকিস্তানে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট হলে আরেক দেশের ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজিত হবে।
যেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয় দুবাইয়ে এবং আগামী মাসে হতে যাওয়া বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে শ্রীলঙ্কায়।
তবে ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ঘটনাটি ছাড়া এর আগে যতবারই কোনো দেশ আইসিসি ইভেন্টে খেলতে কোনো দেশে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, হয় তাদের নিজেদের টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে হয়েছে বা ম্যাচের পয়েন্ট খোয়াতে হয়েছে।
বিবিসি বাংলা