আর্থিক সংকটে দেউলিয়া ম্যাকলসফিল্ডের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প যেন রূপকথা
ইংলিশ ফুটবল পিরামিডে দশটি স্তর আছে। ২০২০ সালে আর্থিক সংকটে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ম্যাকলসফিল্ড টাউন ভিন্ন নামে পরের বছর নতুন করে সেই স্তর থেকে ফুটবল শুরু করে। গত চার মৌসুমে তিনবার উপরের ধাপে উন্নীত হয়ে এখন তাদের অবস্থান ন্যাশনাল লিগ নর্থ, যা ইংলিশ ফুটবল পিরামিডে ষষ্ঠ স্তর। ধীরে ধীরে এই উন্নতির ধারা ধরে রেখে গতকাল (শনিবার) এফএ কাপের তৃতীয় রাউন্ডে তারা হারাল গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ক্রিস্টাল প্যালেসকে! ইতিহাস গড়েছে তারা। ১৯০৯ সালের পর তারাই প্রথম নন-লিগ ক্লাব, যারা এফএ কাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিদায়ঘণ্টা বাজাল। তাদের এই অর্জন সত্যিই অবিস্মরণীয়। এই অখ্যাত দলটির পতন ও উত্থান পৌরাণিক কাহিনীর চরিত্র ফিনিক্স পাখির কথা মনে করিয়ে দিতে বাধ্য।
১৮৭৪ সালে ম্যাকলসফিল্ড টাউন নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ২০২০ সালে তাদের নাম পাল্টে হয় ম্যাকলসফিল্ড এফসি। বর্তমানে ন্যাশনাল লিগ নর্থে খেলা ক্লাবটি ২০২২ সালে নর্থ ওয়েস্ট কান্ট্রিস প্রিমিয়ার ডিভিশন, ২০২৩ সালে এনপিএল ডিভিশন ওয়ান ওয়েস্ট ও ২০২৫ সালে এনপিএল প্রিমিয়ার ডিভিশন জিতে ষষ্ঠ স্তরে উঠে গেছে তারা।
বিজ্ঞাপন
মূল ক্লাব বিলুপ্ত হওয়ার আগে ম্যাকলসফিল্ড টাউন ১৯৭০ ও ১৯৯৬ সালে এফএ ট্রফি জিতেছিল। ক্লাবটি পেশাদার ফুটবল ও নন-লিগের মধ্যেই ওঠানামা করেছে। ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে ইংলিশ পিরামিডের তৃতীয় স্তরে পৌঁছায়। এরপরই তাদের অবনমন, সেটাই ছিল তাদের সর্বোচ্চ স্তরে লিগ খেলার কীর্তি।
বিজ্ঞাপন
ক্লাবের ডাকনাম ‘দ্য সিল্কমেন’, ১৮ ও ১৯ শতকে ইউরোপের সিল্ক বা রেশমি শিল্পের জন্য এই শহরের খ্যাতি থেকেই এই নাম। ম্যাকলসফিল্ড তাদের হোম ম্যাচ খেলে লিজিংডটকম স্টেডিয়ামে, যার আরেক নাম মোস রোজ। মাঠটির ধারণক্ষমতা ৫ হাজার ৩০০।
ম্যাকলসফিল্ড টাউন এর আর্থিক দুর্দশার বিষয়টি ২০১৯ সালের শুরুর দিকে প্রকাশ্যে আসে। তখন জানা যায় যে, টানা তিন মাস বেতন না পাওয়ায় খেলোয়াড়রা কেমব্রিজ ইউনাইটেডের বিপক্ষে লিগ টু-র একটি ম্যাচ বয়কট করার হুমকি দিয়েছেন। এই ঘটনার সূত্র ধরেই ক্লাবটি বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সেই সময় ক্লাবটির ম্যানেজার ছিলেন ইংল্যান্ড ও আর্সেনালের সাবেক তারকা সল ক্যাম্পবেল। মৌসুমের শেষ দিনে ক্লাবটিকে রেলিগেশন থেকে বাঁচানোর পর ২০১৯ সালের আগস্টে তিনি পারস্পরিক সম্মতিতে ক্লাব ছাড়েন। ক্যাম্পবেলের দাবি ছিল, ক্লাবের কাছে তার ১,৮০,০০০ পাউন্ড পাওনা ছিল।
২০১৯ সালের অক্টোবরে খেলোয়াড়রা আবারও বেতনবঞ্চিত হন। ইংলিশ ফুটবল লিগ একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে। প্রথম দলের খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের কারণে কিংস্টোনিয়ানের বিপক্ষে এফএ কাপ ম্যাচটি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ধারে আসা ও যুব দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দল মাঠে নেমে ৪-০ গোলে হেরে যায়। অনেক সমর্থক ম্যাচটি বয়কট করেছিলেন।
২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর খেলোয়াড়দের বেতন না দেওয়ায় ইএফএল ম্যাকলসফিল্ড টাউনকে অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং একটি ডিসিপ্লিনারি প্যানেলে পাঠায়। ৭ ডিসেম্বরের ক্রু আলেকজান্দ্রার বিপক্ষে ম্যাচটি খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের কারণে স্থগিত করলে ক্লাবের ৬ পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়। ২১ ডিসেম্বরের প্লাইমাউথ ম্যাচটিও নিরাপত্তা ইস্যুতে স্থগিত হয়।
২০২০ সালের মে মাসে কর্মীদের বেতন না দেওয়া এবং ম্যাচের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারায় ক্লাবটির আরও ৭ পয়েন্ট কাটা হয়। সিল্কম্যান সাপোর্টার্স ট্রাস্ট খেলোয়াড়দের বেতন পরিশোধে ১০,০০০ পাউন্ড ঋণ দিলেও ক্লাবটির বিরুদ্ধে নতুন করে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। একটি স্বাধীন প্যানেল আরও ২ পয়েন্ট কেটে নেওয়ায় মনে হয়েছিল ম্যাকলসফিল্ড লিগ টু-তে টিকে যাবে, কিন্তু ইএফএল-এর আপিলের পর আরও পয়েন্ট হারার কারণে ক্লাবটি ন্যাশনাল লিগে নেমে যায়।
সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের এক আদেশে ক্লাবটি ব্যবসা গুটিয়ে নিলে বিলুপ্ত হয়। ম্যাকলসফিল্ড টাউনের কাছে ব্রিটিশ কর বিভাগ এর পাওনা ছিল প্রায় ২০০,০০০ পাউন্ড এবং অন্যান্য পাওনাদারদের বকেয়া ছিল ৫,৯২,০০০ পাউন্ড। একই মাসের শেষ দিকে ন্যাশনাল লিগ তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে এবং অক্টোবরে পূর্ণ বহিষ্কার করে।
এর কিছুদিন পরই ক্লাবের সম্পদগুলো স্থানীয় ব্যবসায়ী রবার্ট স্মেথার্স প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ম্যাক ফুটবল লিমিটেডের কাছে বিক্রি করা হয়। তিনি একটি নতুন ক্লাব গঠন করেন, নাম দেন 'ম্যাকলসফিল্ড এফসি'। ২০২১-২২ মৌসুমে ইংলিশ ফুটবলের দশম স্তর থেকে তাদের যাত্রা শুরু করে। ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এবার তারাই গড়ল ইতিহাস।
এফএইচএম/